সর্বোচ্চ উচ্চতার ভাস্কর্য বানিয়ে, সর্বোচ্চ বিপদে মোদি! | The Daily Star Bangla
০৪:০৫ অপরাহ্ন, নভেম্বর ০৫, ২০১৮ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৯:০৬ অপরাহ্ন, নভেম্বর ০৫, ২০১৮

সর্বোচ্চ উচ্চতার ভাস্কর্য বানিয়ে, সর্বোচ্চ বিপদে মোদি!

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

পৃথিবীর সর্বোচ্চ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ- এসব দাবি করার একটা অদ্ভূত বাতিক রয়েছে ভারতীয়দের মধ্যে। ‘কমলাপুর এশিয়ার সবচেয়ে বড় রেল স্টেশন’- কিছুটা বাতিক আমাদেরও ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভুল ভেঙ্গেছে। তবে ভারতীয়রা এবার সত্যি সত্যি পৃথিবীর সর্বোচ্চ দাবি করার একটি উপলক্ষ্য পেয়েছেন। সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের একটি ভাস্কর্য নিমাণ করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার, যার উচ্চতা পৃথিবীর সর্বোচ্চ। কিন্তু সর্বোচ্চ উচ্চতার ভাস্কর্য বানিয়ে, মোদি সরকারও যেনো পড়তে যাচ্ছে সর্বোচ্চ বিপদে।

যতোটা ঢাক পিটিয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য উন্মোচন করা হলো, এখন যেনো ততোটাই নাক কাটা যাচ্ছে মোদি সরকারের।

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু এই ভাস্কর্যের গর্বিত দাবিদার ভারতের বিরুদ্ধে এখন উঠেছে ‘ঋণ করে ঘি’ খাওয়ার অভিযোগ।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই ভাস্কর্য না বানিয়ে সেই টাকা দিয়ে আর কী কী করা যেত- তা নিয়ে দেশটির দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুরু হয়েছে ‘চুলচেরা’ আলোচনা।

জাতীয় পর্যায় ছাড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছেছে। ব্রিটিশ এমপিরা অভিযোগ তুলেছেন, ব্রিটেনের জনগণের করের টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয় ভারতের গরীব মানুষের জন্যে। ভারত সেই টাকা ভাস্কর্য বানিয়ে খরচ করছে। ভারত যদি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভাস্কর্য বানাতে পারে, তবে ভারতের তো ব্রিটেনের অনুদান দরকার নেই। সুতরাং ভারতকে অনুদান দেওয়া বন্ধ করা হোক। উল্লেখ, গত কয়েক বছরে ব্রিটেন প্রায় ১১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে ভারতকে।

এছাড়া ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীন জটিলতা তীব্র হয়ে উঠছে। গুজরাট রাজ্যের নর্মদা জেলার নর্মদা নদীতে বাঁধ দিয়ে সর্দার সরোবরে ভাস্কর্য বানানোর ফলে উদ্বাস্তু হওয়া আদিবাসীদের ঠিক মতো পুর্নবাসন না করার অভিযোগ সামনে উঠে আসছে। আর সেই সরোবরে বাঁধ দিয়ে বানানো হয়েছে ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাস্কর্য। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন- ‘মহাত্মা গান্ধির আগে তার শিষ্য প্যাটেলের মূর্তি কেনো?’

বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য সম্পর্কে কিছু তথ্য

পদ্মভূষণ খেতারপ্রাপ্ত ৯৩ বছর বয়সী স্থাপত্যশিল্পী রামবন সুতার এর নকশায় তৈরি হওয়া ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১৮২ মিটার যা একটি ৬০ তলা দালানের সমান। এখন এটিই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্য। এটি তৈরি করতে ১৮ হাজার ৫০০ টন স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে। ২০১৪ সালে এটি তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রায় চার হাজার ব্যক্তি প্রায় চার বছর পরিশ্রম করে ব্রোঞ্জের এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন। সর্দার সরোবরে বাঁধ দিয়ে প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে এটি।

এখন ভাস্কর্য হিসেবে উচ্চতার দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের ‘বসন্ত মন্দিরের বুদ্ধ মূর্তি’-টি। এর উচ্চতা ১৭৭ মিটারের একটু বেশি। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের উশিকু দাইবুৎসু বুদ্ধ মূর্তিটি। এর উচ্চতা ১০০ মিটার। আর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে আমেরিকার বিখ্যাত ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ যার উচ্চতা ৯৩ মিটার।

ভাস্কর্য তৈরির টাকায় কী কী করা যেতে পারতো?

অর্থনৈতিকভাবে ভারত এখন বিশ্বের ষষ্ঠ শক্তিধর দেশ। তবে তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটিতে ২৭ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন। দেশটির স্বাধীনতার ৭২ বছর পরেও যখন ঋণের দায়ে কৃষক আত্মহত্যা করে তখন সেই দেশে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে ভাস্কর্য বানানো কতটা যুক্তিযুক্ত? ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে- ‘এ শ্রদ্ধার্ঘ্য না-কি অপব্যয়?’

সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’ নামের বল্লভভাই প্যাটেল ভাস্কর্য তৈরির এই টাকায় দেশটির কৃষিক্ষেত্রের চেহারা বদলে দেওয়া যেতো। কৃষি প্রধান দেশটিতে এ টাকায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সেচের ব্যবস্থা করা যেতো। ১৬২টি ছোট সেচ প্রকল্প মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হত। তৈরি করা যেতো ৪২৫টি ছোট বাঁধ।

এ টাকায় ঢেলে সাজানো যেতো ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও। বানানো যেতো দুটি নতুন আইআইটি ক্যাম্পাস। একটা আইআইটি তৈরির খরচ প্রায় ১,১৬৭ কোটি টাকা। কিংবা বানানো যেত দুটি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সের (এইমস) ক্যাম্পাস। কারণ একটি ‘এইমস’ তৈরিতে খরচ প্রায় ১,১০৩ কোটি টাকা। একটি আইআইএম ক্যাম্পাস তৈরির খরচ প্রায় ৫৩৯ কোটি টাকা। ভাস্কর্য বানানোর টাকায় পাঁচটি নতুন আইআইএম ক্যাম্পাস তৈরি করা যেতো।

নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে আনা যেতে পারতো পরিবর্তনের জোয়ার। প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি নতুন সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা যেতো এই টাকায়। যেখানে একটি তৈরিতে খরচ প্রায় ৫২৮ কোটি টাকা।

ভারতের মহাকাশ গবেষণায় অভাবনীয় উন্নতি করার সুযোগ ছিলো এই টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে। কেননা, নেই খরচে চালানো যেতো ছয়টি মঙ্গল অভিযান। একটি অভিযানের খরচ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। একটি চন্দ্রাভিযানের খরচ মোটামুটি ৮০০ কোটি টাকা। তাই অনায়াসে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর অধীনে তিনটি চন্দ্রাভিযানও করা যেতো এই ভাস্কর্য তৈরির টাকায়।

ভাস্কর্য বিরোধীদের ভাষ্য

বল্লভভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য উন্মোচনকে ঘিরে নর্মদা জেলার আদিবাসী গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। আদিবাসী নেতাদের মতে, একটা সুযোগ এসেছে আদিবাসীদের একজোট হওয়ার। গুজরাত তো বটেই, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান রাজ্যে যেখানে যতো আদিবাসী গ্রাম রয়েছে, সেখান থেকে আরএসএস-বিজেপি-র সব ধ্যানধারণাকে নির্মূল করে দেওয়ার ডাক দিয়েছেন তারা। ক্ষুব্ধ স্থানীয় আদিবাসী ও কৃষকদের একটি অংশ বলছেন, ফসলের দাম পাওয়া যাচ্ছে না, চাষের পানি নেই- অথচ বিপুল অর্থ খরচ করে এই ভাস্কর্য বানানো হল।

ভাস্কর্যটির ব্রোঞ্জের পাতগুলো তৈরি হয়েছে চীনে এবং প্রায় ৩০০ চীনা কর্মী দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন। ভারতীয় গরীব মানুষের প্রাপ্য অর্থ ভাস্কর্যের পেছনে খরচ করলেও, যা বানানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। এনিয়ে রসিকতাও চলছে।

কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এটিকে মেড ইন চায়না বলে ব্যঙ্গ করেছেন।

মহাত্মা গান্ধির আগে তাঁর শিষ্য সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলো কেন?- এমন প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর।

সিপিএম নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, কংগ্রেসের প্রাণপুরুষ প্যাটেল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। আর আজ আরএসএস এর সমর্থন নিয়ে বিজেপি প্যাটলের নাম করেই নির্বাচনী প্রচারে নেমেছে।

এছাড়াও, গত ৩১ অক্টোবর বল্লভ ভাই প্যাটেলের ১৪৩তম জন্মদিবসে উদ্বোধন হওয়া এই ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়েছে গ্রেট ব্রিটেনেও। সেখানকার স‌ংবাদমাধ্যম ও এমপিদের একাংশের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ব্রিটেনের থেকে বিরাট অঙ্কের অর্থসাহায্য নিয়ে ভারত সেই টাকা ঘুরপথে ভাস্কর্য বানানোর পেছনে খরচ করেছে। ব্রিটেনের করদাতাদের অর্থ এভাবে কেনো খরচ হলো- তা নিয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা।

কে এই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল?

১৮৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর গুজরাটের খেদা জেলার নাদিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। সরদার প্যাটেল নামেই বেশি পরিচিত এই ভারতীয় পণ্ডিত ও জাতীয়তাবাদী নেতাকে ভারতের ‘লৌহমানব’ বলা হয়। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সর্দার প্যাটেল ব্রিটিশ আমলের ১৬২টি করদ রাজ্যকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন বলে কেউ কেউ তাকে জার্মানির বিসমার্কের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে দুটি দেশ করার পেছনে সর্দার প্যাটেলকে দায়ী করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ভারত ভাঙ্গার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি মহাত্মা গান্ধিকে প্ররোচিত করেছিলেন।

এই ভারতীয় নেতা ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে লণ্ডনে যান। দেশে ফিরে একজন আইনজীবী হিসেবে কাজে যোগ দেন।

মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার অভিযোগে সর্দার প্যাটেল আরএসএস-কে নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি এই সংগঠনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিষ ছড়ানোর অভিযোগ করেছিলেন। তারই বিশালাকার ভাস্কর্য বানালেন আরএসএস থেকে বিজেপিতে আসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

১৯৫০ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বোম্বাই তথা আজকের মুম্বাই শহরে ৭৫ বছর বয়সে এই ভারতীয় নেতা মৃত্যু বরণ করেন।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top