মেট্রো লাইন ৬ এর বর্ধিত পরিকল্পনা নিয়ে রেলওয়ের আপত্তি | The Daily Star Bangla
০৫:৫৬ অপরাহ্ন, জানুয়ারি ২২, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, জানুয়ারি ২২, ২০২০

মেট্রো লাইন ৬ এর বর্ধিত পরিকল্পনা নিয়ে রেলওয়ের আপত্তি

মেট্রোরেলের একটি লাইন কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে মেট্রোরেলের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রধান এই রেলস্টেশনকে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবে (এমএমটিএইচ) পরিণত করার যে মেগা পরিকল্পনা রেলওয়ে করছে তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শুরুর দিকে দেশের প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্পের ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নকশা করা হয়েছিল। পরে কমলাপুর রেলস্টেশনের সঙ্গে লাইনটি সংযোগ করার জন্য একটি স্কাইওয়াকের পরিকল্পনা করা হয়।

গত বছর মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সরকারি মালিকানাধীন সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এমআরটি লাইন-৬ সরাসরি কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করে।

কিন্তু, গত মাসে রেলওয়ে ভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, এমআরটি লাইন-৬ সম্প্রসারণ করে তা কমলাপুর স্টেশনে সংযুক্ত করার বর্তমান প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়।

রেল কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর সভার এই সিদ্ধান্ত ডিএমটিসিএলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে।

তাতে আরও বলা হয়েছে, “বিস্তারিত আলোচনার পরে দেখা গেছে, এমআরটি লাইন-৬ এর সম্প্রসারণ এমএমটিএইচ এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যান্য উন্নয়ন কাজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়বে।”

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় “কমলাপুর রেলস্টেশনে বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন কর্মসূচি” নিয়ে আলোচনা হয়। দ্য ডেইলি স্টার সভাটির সিদ্ধান্তের একটি অনুলিপি পেয়েছে।

রেলের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপানি সংস্থা কাজিমা কর্পোরেশন এরই মধ্যে হাবটির একটি রূপরেখা তৈরি করেছে। তারা বাংলাদেশ রেলওয়েকে জানিয়েছে যে যদি এমআরটি লাইন-৬ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গৃহীত হয় তাহলে তারা তাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে ডিএমটিসিএলকে তাদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি ১২ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, “এটি কমলাপুর স্টেশনকে কেন্দ্র করে আমাদের পরিকল্পনা ব্যহত করবে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।”

গতকাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে একজন রেল কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে তারা এখনও ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে কোনো সাড়া পাননি। তিনি বলেছেন, “শিগগিরই তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হবে।”

এমএমটিএইচের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার সময়, রেলওয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি প্রচলিত রেলপথ, উচ্চগতির রেলপথ, এমআরটি লাইন ১, ২ এবং ৪, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাস স্টপেজ, একটি সাবওয়ে এবং স্কাইওয়াকের মাধ্যমে এমআরটি লাইন-৬ এর সংযোগ স্থাপন করবে।

রেলওয়ের পক্ষে এমএমটিএইচের দায়িত্বে থাকা মনিরুল ইসলাম ফিরোজি সম্প্রতি এই সংবাদপত্রকে বলেছেন, “যে কোনো পরিবর্তন এবং বিচ্যুতি পুরো পরিকল্পনাটিকে বিপর্যস্ত করবে।”

২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানী এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে ছয়টি মেট্রো লাইন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এগুলোর একটি লাইন হবে মাটি থেকে ওপরে, একটি ভূগর্ভস্থ এবং চারটি ওপর এবং ভূগর্ভস্থ উভয় পথের সমন্বয়ে।

ভূগর্ভস্থ এমআরটি লাইন ১ কমলাপুরকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এমআরটি লাইন ২ কমলাপুর হয়ে গাবতলীকে চট্টগ্রাম রোডের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। কমলাপুর ভূগর্ভস্থ এমআরটি লাইন-৪ দিয়ে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সংযুক্ত হবে।

এমআরটি লাইন-৬ এর নির্মাণ কাজ চলছে। এর জন্য ব্যয় হচ্ছে ২২ হাজার কোটি টাকা। প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে এটি।

ডিএমটিসিএল তাদের মেট্রোরেলের লাইনটি কমলাপুর পর্যন্ত বাড়াতে চাইছে, যাতে মেট্রোরেল ব্যবহারকারীরা সরাসরি দেশের বৃহত্তম রেলস্টেশনটিতে যেতে পারেন।

ডিএমটিসিএল ইতোমধ্যে একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে এবং অতিরিক্ত ১.১৬ কিলোমিটার লাইনের জন্য স্থান নির্বাচন করেছে। ডিএমটিসিএলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই রুটে থাকা ৩১টি স্থায়ী কাঠামো ভাঙতে হতে পারে।

ডিএমটিসিএল এর আগে মতিঝিলকে কমলাপুরের সঙ্গে স্কাইওয়াকের মাধ্যমে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল। যা শুধু মাত্র হাঁটার জন্য ব্যবহৃত হবে।

ডিএমটিসিএল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক কিলোমিটারেরও বেশি পথ হাঁটতে হবে বলে তারা পরিকল্পনাটি বাদ দিয়েছেন।

এক্সপ্রেসওয়ে: আরেকটি সমস্যা

রেল কর্তৃপক্ষ একই বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে (বিবিএ) পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “এফডিইই (ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস) এর প্রস্তাবিত স্থান অতীশ দীপঙ্কর রোডে স্থানান্তরিত করতে হবে এবং এটি এমএমটিএইচের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সবচেয়ে ভালো প্রকৌশলগত সমাধান বের করা উচিত।”

সেতু কর্তৃপক্ষ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ১৯.৭৩ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে।

পুরো পরিকল্পনায় এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন জায়গায় সংযোগ রাস্তা ও র‌্যাম্প রয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য কমলাপুরের কাছে একটি র‌্যাম্প এবং টোল প্লাজা থাকবে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক এএইচএমএস আক্তার জানান, তারা রেলওয়ের চিঠি পেয়েছেন।

সাম্প্রতিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে কমলাপুর এলাকায় একটি যৌথ জরিপ করা হবে। কারণ বেশ কয়েকটি কর্তৃপক্ষ এই এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

তিনি ১২ জানুয়ারি ডেইলি স্টারকে বলেছেন, “আমাদের পরিকল্পনা যদি রেলওয়ের পরিকল্পনায় কোনো সমস্যা করে, আমরা আলোচনার মাধ্যমে র‌্যাম্প ও টোল প্লাজাটি একটু সরিয়ে নেব।”

এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে এবং একটি প্রকৌশলগত সমাধান খুঁজে বের করতে যৌথ জরিপ করা হবে বলেও তিনি জানান।

রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেছিলেন যে তারা বিবিএকেও একটি চিঠি দেবে কারণ তারা এখনও এ বিষয়ে কোনও সাড়া দেয়নি।

রেলওয়ের পরিকল্পনা

ওই রেল কর্মকর্তাদের মতে, এমআরটি লাইন ৬ এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিষয়ে সর্বশেষ প্রস্তাব কমলাপুর স্টেশনে এমএমটিএইচ নির্মাণের রেলওয়ের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য জি২জি (সরকারের সঙ্গে সরকার) পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের জন্য সরকার ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। গত বছরের মার্চ মাসে তৃতীয় বাংলাদেশ-জাপান বৈঠকে এই প্রাথমিক পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হয়।

বুয়েটকে এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জরিপ পরিচালনা করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম ফিরোজি বলেন, হাবটি নিয়ে ৮০টিরও বেশি সভা হয়েছে এবং জাপান সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনটি বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সভায় ডিএমসিএল কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং তারা প্রথম থেকেই পরিকল্পনার বিষয়ে জানেন।

তিনি বলেন, “আমরা এমআরটি ৬ সহ সকল সম্ভাব্য সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় করার জন্য কাজ করছি। তবে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি ৬ সম্প্রসারণের বর্তমান প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটি আমাদের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে।”

কাজিমা কর্পোরেশন ইতিমধ্যে রেলওয়েকে জানিয়েছে যে এমআরটি ৬ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাটি গৃহীত হলে তারা তাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করবে।

এই অবস্থায় রেলওয়ে কাজিমা কর্পোরেশনকে এমআরটি ৬ এর জন্য বিকল্প পথ বের করার জন্য অনুরোধ করেছিল যাতে হাবের পরিকল্পনায় কোনো সমস্যা না হয়। এটি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ফিরোজি।

এমআরটি ৬ এর জন্য প্রস্তাবিত স্কাইওয়াকের ব্যাপারে রেলওয়ের কোনও আপত্তি ছিল না। কারণ এমএমটিএইচ এটি বিবেচনায় রেখেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ রেলওয়ে ইতিমধ্যে কমলাপুর স্টেশনের জমি ব্যবহারের জন্য একটি খসড়া পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। কারণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মেগা প্রকল্প স্টেশনটিকে ঘিরে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

তিনটি বিকল্প

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক বলেছেন, তারা এমআরটি ৬ এর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার বিষয়ে রেলওয়ের উদ্বেগ নিয়ে অবহিত আছেন। তাই এই লাইনের সম্প্রসারণের জন্য তিনটি বিকল্প নিয়ে কাজ করছেন।

প্রথম বিকল্প, কমলাপুরের এমআরটি ১ এর ভূগর্ভস্থ স্টেশনের উপরে এমআরটি ৬ একটি স্টেশন নির্মাণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিকল্প, রেলওয়ের জমির বাইরে এমআরটি ৬ এর কমলাপুর স্টেশনটি নির্মাণ করা যেতে পারে। এবং তৃতীয় বিকল্প হচ্ছে রেলওয়ে থেকে কিছু জমি নিয়ে স্টেশনটি বানানো।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে ১২ জানুয়ারি বলেছেন, “আমরা এমআরটি ৬ এবং ১ উভয়ের পরামর্শদাতাদের সঙ্গে বৈঠক করব এবং এরপরে সমাধানের জন্য শিগগিরই রেলওয়ের সঙ্গে কথা বলব।”

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top