মারা হয়েছে না মারামারি? | The Daily Star Bangla
০৫:০৯ অপরাহ্ন, নভেম্বর ০৬, ২০১৯ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৭:৫৬ অপরাহ্ন, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

মারা হয়েছে না মারামারি?

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলনের এক পর্যায়ে বাসভবনে অবরুদ্ধ করা হয় উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে। ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উপর হামলা করে উপাচার্যকে বাসভবন থেকে বের করে আনে। সেসময় দুজন শিক্ষক ড. অজিত মজুমদার এবং অধ্যাপক রায়হান রাইনের সঙ্গে ৫ নভেম্বর কথা হয় দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনের। অধ্যাপক রাইন বলছেন মারা হয়েছে, গণমাধ্যমে তার প্রমাণ আছে। ড. মজুমদার বলছেন, দুই পক্ষের মধ্যে ঘটনা ঘটেছে।

তারপর উপাচার্য সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনকারীরা বিশেষ করে ছাত্রীরা হল থেকে বের হয়ে এসে প্রতিবাদ মিছিল করতে থাকেন। তারপর আবার কথা হয় অধ্যাপক রাইন সঙ্গে। কিন্তু ড. মজুমদারে সঙ্গে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি। তিনি ফোন ধরেননি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. অজিত মজুমদার দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনকে বলেন, “দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়েছে। দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে।”

আপনি কী ঘটনাটি জানতে পেরেছেন?- “হ্যাঁ, জানতে পেরেছি।”

কারা হামলা করেছে বলে জেনেছেন?- “কারা হামলা করেছে বিষয়টি তা না… এখানে দুটি পক্ষ ছিলো।… এক পক্ষ এখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়েছিলো। অন্যপক্ষ আজকে এসেছে… এইতো।”

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যে উপাচার্যপন্থি শিক্ষকদের নির্দেশনায় এই হামলা হয়েছে।– “হ্যাঁ, এমন দাবিতো তো অন্যরাও করছে। এক পক্ষের নির্দেশনায় তারা আন্দোলন করছে। দুই পক্ষই দুই পক্ষের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ আনছে।”

পুরো বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?- “আমরা অনেক আগে থেকেই শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছি। গত (৪ নভেম্বর) রাতেও আমরা এ নিয়ে কথা বলেছি। এখন এক পক্ষ যদি বলে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার কোনো সুযোগ নেই, তাহলে আর বিষয়টি কীভাবে দেখবো…।”

তাই বলে কী হামলা হতে পারে? “দুই পক্ষই যখন ইয়ে করে তখন তো তাকে হামলা বলে না।”

হামলাকারীদের তো চেনা গিয়েছে?- “আমি দেখেছি না কী। দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়েছে। দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়েছে।… বারে-বারে একই কথা বলছি যে এখানে দুই পক্ষ।”

কিন্তু, ‘ছাত্রলীগ’ শব্দটি এসেছে তো।- “ছাত্রলীগ শব্দটি এসেছে… এখানে দুই ধরনের ছাত্র রয়েছে। ছাত্রলীগ ছিলো আর অন্যান্য সংগঠনের ছাত্ররা ছিলো। এখানেই দুই পক্ষের ছাত্র ছিলো।”

এখনতো সেখানে ছাত্রলীগ অবস্থান করছে। তাহলে কী ছাত্রলীগ হামলা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিলো?- “ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে পারে, দিতে পারে সেটা।”

একজন শিক্ষক হিসেবে আপনি এই হামলাটিকে কীভাবে দেখছেন?- “আমি হামলাকে ভালোভাবে দেখি নাই। আমি (আন্দোলনকারীদের শিক্ষার্থীদের) অবস্থানকেও ভালোভাবে দেখি নাই। গতকাল এই অবস্থান কর্মসূচি থেকে (আন্দোলনকারীরা) তাদের শিক্ষকদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে ছিলো- সে সম্পর্কে আপনারা (সাংবাদিকরা) কেনো প্রশ্ন তোলেন না?”

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’র মুখপাত্র দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনকে বলেন, “শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। হামলাকারীদের কারো কারো কাছে পিস্তলও ছিলো। ছবিতে তা ধরা পড়েছে। কোনো কোনো নিউজে এসেছে। আমাদের ওপর যেটা হয়েছে- প্রথমে শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি দল এসেছিলো। আমাদের সঙ্গে ধাক্কা-ধাক্কি করে পরে সেখান থেকে তারা ফিরে যায়। ফিরে গিয়ে তারা ছাত্রলীগকে পাঠিয়েছে। ছাত্রলীগ এসে আমাদেরকে মেরে-মাড়িয়ে, লাথি দিয়ে সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়। কয়েকজনকে তারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখন পর্যন্ত তাদের ট্রেস পাচ্ছি না। আহত হয়েছেন অনেকে। এখনো (হামলার) আশঙ্কা কাটেনি। যেকোনো মুহূর্তে তারা আক্রমণ করতে পারে।”

“প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষকরা যারা ছিলেন তারা পাশে থেকেই এই হামলাটি পরিচালনা করেছেন। পুলিশও পাশে ছিলো। আক্রমণ যখন হয় পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছে।”

উপাচার্য বলেছেন, ‘তারা (ছাত্রলীগ) যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে’।– “হ্যাঁ, তাদের কাছে এটি ভালো কাজ। মিথ্যা মামলা দেওয়া, শিক্ষার্থীদের পেটানো- এগুলো তো তার কাছে ভালো কাজই হবে। তার দিক থেকে এটি বলাই সঙ্গত মনে হয়।… (হামলাকারীদের উদ্দেশে) উপাচার্যপন্থি শিক্ষকরা বলেছেন, ‘রক্ত না ঝরা পর্যন্ত মারতে থাকো’।”

“আরেকটি দিক হচ্ছে- শিবির ব্লেম দেওয়া একটি কৌশল। কাউকে শিবির ব্লেম দিলে তাকে মারা যায়। সবাইকে তারা মেরেছে। তার মানে কি এখানে সবাই ‘জামাত-শিবির’? বুয়েটে আবরারকে হত্যা করা হলো ‘শিবির’ বলে। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলো ‘শিবির’ বলে। এই ব্লেম দিয়ে যে কাউকে মারা যায়, নিপীড়ন করা যায়। প্রশাসন এটিকে যদি ভালো মনে করে তাহলে এর চেয়ে ন্যক্কারজনক কোনো ঘটনা আর হতে পারে না।”

উপাচার্য আরও বলেছেন, ছাত্রলীগ এসে আন্দোলনকারীদের যদি না সরিয়ে দিতো তাহলে তিনি বাসা থেকে বের হতে পারতেন না।– “না, তার জন্যে একটি গেট খোলা ছিলো। আমাদের এই অবস্থানটি প্রতীকী অবস্থান ছিলো।”

অভিযোগ উঠেছে- উপাচার্যকে লক্ষ্য করে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করা হয়েছে।– “অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ কেউ করেননি। এখানে সবকিছু মিডিয়ার সামনে হয়েছে।”

ঘটনাটিকে ‘শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের হাতাহাতি’ হিসেবে বলা হচ্ছে।– “শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের হাতাহাতি না। আমাদের শিক্ষার্থীরা তো সেখানে বসে গান গাচ্ছিলো। তারা খুব শান্তিপূর্ণভাবে বসেছিলো। তখন হামলাকারীরা এসে আন্দোলনকারীদের মেরে উঠিয়ে দেয়- এটি কীভাবে দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়। প্রশাসনের তরফ থেকে মিথ্যাচার করা এখন বড় কৌশল। এভাবেই তারা রক্ষা পেতে চাচ্ছে।”

“কিন্তু, আমরা মনে করি, বল প্রয়োগ করে করে কোনো নৈতিক অবস্থানকে নড়ানো যায় না। তাদের হামলার কারণে আমরা আমাদের নৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাবো না। আমরা আন্দোলন থেকে সরবো না। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন যে অবস্থা চলছে তাতে এই প্রশাসনকে না সরালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কখনোই ভালো হবে না। কারণ, এই প্রশাসন যেভাবে চালাতে চাচ্ছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে কখনোই ভালো হবে না।”

সমস্যা সমাধানে আপনাদেরকে কি আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো? আপনারা কি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?- “যারা আলোচনা করতে এসেছিলেন তারা উপাচার্যপন্থি শিক্ষক। তারা মনে করেন, উপাচার্য জিতবেন। তারা সেটি মনে করতেই পারেন। আমরা বলেছি, উপাচার্য দুর্নীতি করেছেন। উনি যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন, সেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এই দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে সমাধান হবে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেন, তাহলে সেটিই হচ্ছে সমাধান। আমরা এ কথাই তাদেরকে বলেছি।”

বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য- “বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ হচ্ছে আন্দোলন দমানোর সর্বশেষ কৌশল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মারধরের পর এখন সবকিছু বন্ধ করে দেওয়াটি হচ্ছে প্রশাসনিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার। এর মাধ্যমে আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে চায় না। তারা বেরিয়ে এসেছে। অনেকে উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে। তারা ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদ করছে।”

“আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নৈতিক অবস্থান দুর্নীতির মাধ্যমে নিঃশেষ হয়েছে। এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ ঘোষণা দিয়ে তাদের পরাজয়কে চূড়ান্ত করেছে। আমি মনে করি, এটি তাদের নৈতিক পরাজয়। চূড়ান্ত পরাজয়।”

এর ফলে আন্দোলনের ওপর প্রভাব পড়বে কী?- “শিক্ষার্থীদের অনেকে অবস্থান নিয়েছে। তবে বল প্রয়োগের মুখে আমরা কতোক্ষণ টিকে থাকতে পারবো সেটি এখনো বলা যাচ্ছে না। যে সংখ্যক শিক্ষার্থী আজকে বেরিয়ে আসছে তাতে আন্দোলন বেগবান হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”

আরও পড়ুন:

হল না ছাড়লে ব্যবস্থা: জাবি হল প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি

জাবিতে সংহতি সমাবেশ

জাবি বন্ধ ঘোষণা, প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল

আমার জন্যে এটা অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন: জাবি উপাচার্য

জাবি শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ, আহত ২০

জাবি উপাচার্য এখনও অবরুদ্ধ

জাবি উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষার্থীদের অবরোধ

অডিও ফাঁস: উপাচার্য নিজেই টাকা ভাগ করে দিয়েছেন

জাবি উপাচার্যের অপসারণ দাবি ফখরুলের

ঢাবি সিনেট থেকে অব্যাহতি চেয়ে শোভনের চিঠি

উপাচার্য-ছাত্রলীগ পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও পক্ষ-বিপক্ষের শিক্ষক ভাবনা

আমরা ‘ন্যায্য পাওনা’ দাবি করেছিলাম: রাব্বানী

মিথ্যা বলেছে ছাত্রলীগ, ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুড়লেন জাবি উপাচার্য

আন্দোলনকারীদের ২ শর্ত মেনে নিলো জাবি প্রশাসন

শিক্ষা নয়, জাবির আলোচনার বিষয় ‘২ কোটি টাকা’র ভাগ-বাটোয়ারা

‘২ কোটি টাকা ভাগের সংবাদে শিক্ষক হিসেবে খুব বিব্রত বোধ করি’

জাবি উপাচার্যের সঙ্গে ছাত্রলীগের ‘প্রশ্নবিদ্ধ বৈঠক’, টিআইবির উদ্বেগ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর

জাবি ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দল ও সংঘর্ষের নেপথ্যে ৪৫০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ

জাবিতে চলমান উন্নয়ন পরিকল্পনার ‘মাস্টারপ্ল্যানে’ গোড়ায় গলদ!

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top