বন্দরে পণ্য খালাস ব্যাহত, বাড়ছে কনটেইনারের স্তূপ | The Daily Star Bangla
০৭:১৪ অপরাহ্ন, এপ্রিল ০১, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৯:০৮ অপরাহ্ন, এপ্রিল ০১, ২০২০

বন্দরে পণ্য খালাস ব্যাহত, বাড়ছে কনটেইনারের স্তূপ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সাধারণ ছুটিতে চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য আমদানি পণ্য খালাস করতে পারছেন না আমদানিকারকরা। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনারের স্তূপ বাড়ছে। সে সঙ্গে ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

আমদানিকারক, কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবহন সংকট এবং বন্দর থেকে পণ্য খালাসের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ভোগ্যপণ্যহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল খালাসে বিপত্তি তৈরি হয়েছে।

আমদানিকারক ও কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দর থেকে এসব পণ্য খালাসের আগে বিএসটিআই, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সরকারি বিভিন্ন ল্যাবে পণ্যের নমুনা পরীক্ষণ ও ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাড়পত্র নিতে পারছেন না আমদানিকারকরা। ফলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষও পণ্য খালাসের ছাড়পত্র দিতে পারছে না।

আমদানিকারকরা বলছেন, গত সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভোগ্যপণ্য, ওষুধ ও সেবাসামগ্রীর পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল খালাসের নির্দেশনা দিলেও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ যানবাহন সংকট থাকায় পণ্য পরিবহন করতে পারছেন তারা। এছাড়া বন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতায় পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তারা।

বন্দরের কনটেইনার জট ও শিল্প কারখানায় স্থবিরতার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে ৩০ মার্চ একটি অফিস আদেশ জারি করেছে এনবিআর। সেখানে শিল্পের কাঁচামাল এবং সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমদানি পণ্যের শুল্কায়নে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কাস্টম হাউজগুলোকে।

তবে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা বন্ধ থাকায় এ সুবিধা কোন কাজে আসছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই দিনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি কনটেইনার জমে যাবে। ৪৯ হাজার কনটেইনার ধারণ ক্ষমতার বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে এখন জমা পড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কনটেইনার। যদিও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ধারণ ক্ষমতার অন্তত ৩০ শতাংশ খালি রাখতে হয়। এখন সে সুযোগ না থাকায় গত ১০ দিন ধরেই বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য মতে, সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ৪৪ হাজার ৯২৬ টিইউএস (প্রতিটি ২০ বর্গফুট হিসাবে) কনটেইনার। অথচ ২৪ মার্চ পর্যন্ত ছিল মাত্র ৩০ হাজার ৮০৪ টিইউএস কনটেইনার। এ সময়ে প্রতিদিন বন্দরে জাহাজ থেকে চার থেকে পাঁচ হাজার কনটেইনার নামলেও গড়ে ১৫০০ কনটেইনারের কম খালাস হয়েছে। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে কনটেইনারের চাপ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পণ্য খালাস কমে যাওয়ায় বন্দরের প্রায় প্রতিটি ইয়ার্ডেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কনটেইনার রয়েছে। এখন আমাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হলে এসব কনটেইনার দ্রুত খালাস করার জন্য আমদানিকারকসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে দু-একদিনের মধ্যেই বন্দরের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কনটেইনার জমা হবে। এতে বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য মতে, মার্চ মাসের প্রথম দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বন্দরের ইয়ার্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার পর্যন্ত কনটেইনার খালাস নিয়েছেন আমদানিকারকরা। গত সোমবার ও মঙ্গলবার তা কমে নেমে এসেছে যথাক্রমে ১৭০৫ ও ১৯০৮ কনটেইনারে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ভিয়েতনাম থেকে ডায়িং শিল্পের ক্যামিকেল সোডিয়াম সালফেট আমদানি করেছে চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠান মেরিন এন্টারপ্রাইজ। গত ১৭ মার্চ চালানটি বন্দরে এসে পৌঁছালে খালাস করতে পারছেন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি। গত ৩০ মার্চ এনবিআর একটি নির্দেশনা অনুযায়ী পণ্যটি খালাসের জন্য কাস্টমসে আমদানি নথি দাখিল করা হলেও বুধবার পর্যন্ত পণ্যটি খালাস করতে পারেননি আমদানিকারক।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোতালেব হোসেন বলেন, খালাসের আগে আমদানি পণ্যের নমুনা পরীক্ষণের প্রয়োজন হওয়া এর নমুনা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের বিসিএসআইআরে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি গিয়ে কাউকেই পাওয়া যায়নি। সরকার ঘোষিত ছুটির করণে প্রতিষ্ঠানটির কোন কর্মকর্তাই উপস্থিত ছিলেন না। একই অবস্থা অন্যান্য পণ্যের নমুনা পরীক্ষণের ক্ষেত্রেও।

তিনি বলেন, এনবিআর কাগজে কলমে সব ধরনের শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্য খালাসের সুযোগের কথা বললেও বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না। বন্দর থেকে পণ্য খালাসে যেসব প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে তা খোলা না হলে এ সুযোগ কাজে আসবে না।

এ বিষয়ে বিসিএসআইআর এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দিপংকর চক্রবর্তী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অফিস চালু রাখার বিষয়ে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত আমরা অফিস কার্যক্রম চালু করতে পারছি না।

একইভাবে বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করে তা খালাস করতে পারছে না দেশের বৃহৎ শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল। প্রতিষ্ঠানটির সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এর মহাব্যবস্থাপক তানজির হেলাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমাদের বিভিন্ন পণ্য ও পণ্যের কাঁচামাল চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে রয়েছে। অথচ এসব পণ্য কারখানায় নিতে না পারায় অনেক কারখানা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। দ্রুত চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয় করে স্বল্প পরিসরে খোলা না রাখলে দেশের সব সেক্টরেই অচলাবস্থা তৈরি হবে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কাজি মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম কাস্টমস তিন শিফটে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে সিংহভাগ পণ্য খালাসের আগে বিভিন্ন সংস্থা থেকে পণ্যের নমুনা ও মান পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগই বন্ধ থাকায় কাস্টমস থেকে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাসের ছাড়পত্র দেওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম চেম্বার এন্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, আমদানি পণ্যের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ পণ্যই খালাস হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। চলমান পরিস্থিতিতে বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহন পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য খালাসের আগে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থার অনুমতি ও প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা না আসায় পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। গত সোমবার থেকে এনবিআর শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্য খালাসের নির্দেশনা দিলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে পণ্য হাতে পাচ্ছেন না আমদানিকারকরা।

তিনি বলেন, পণ্য খালাস করার জন্য শিপিং এজেন্ট, সিএন্ডএফ এজেন্টসহ বন্দরের যেসকল শ্রমিক রয়েছে তাদের অধিকাংশই ছুটিতে রয়েছেন। পরিবহন শ্রমিকরাও বের হচ্ছেন না। ফলে সব মিলিয়েই বন্দর থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এসব সমস্যা তুলে ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরেই পত্র দেওয়া হয়েছে। আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যেই সমাধান হবে।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানিকারকরা। তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজেএমইএর প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম বলেন, যেহেতু অধিকাংশ পোশাক কারখানায় বন্ধ তাই কাঁচামাল খালাস করে কোনো লাভ হবে না তাদের। তাছাড়া যানবাহনও পাওয়া যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, কমলাপুর আইসিডিতে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার রাখার জায়গা না থাকায় গত রোববার থেকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর আইসিডিগামী কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। একইভাবে যানবাহন সংকট থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেসরকারি ডিপোতে পণ্য স্থানান্তর কার্যক্রমও।

ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে প্রতিদিনই বাড়ছে কনটেইনারের স্তূপ।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top