নদী দখলকারীদের কারাদণ্ডের বিধান চায় নদী রক্ষা কমিশন | The Daily Star Bangla
০৫:৩৪ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৬:০০ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৯

নদী দখলকারীদের কারাদণ্ডের বিধান চায় নদী রক্ষা কমিশন

জায়মা ইসলাম

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি) সুপারিশ করেছে যে, নদী দূষণকারীদের কেবল জরিমানা না করে, ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ডও দেওয়া উচিত।

কমিশনটির বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩’র সংশোধনী খসড়াতে এই সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান এনআরসিসির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার।

গতকাল (২৮ ডিসেম্বর) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তিনি জানিয়েছেন, নদী দখলকারীদের ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু, দূষণকারীরা শুধুমাত্র জরিমানা দিয়েই মুক্তি পেয়ে যায়।

তিনি বলেন, “নদী দূষণকারীরা বড়-বড় শিল্পকারখানার মালিক। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে নদী দূষণের জন্যে তাদেরকেও কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।”

“নদীতে বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না,” যোগ করেন তিনি।

২৯ জানুয়ারি রুল জারি করে হাইকোর্ট নদী দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া এবং অপরাধীদের আরও কঠোর শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করেন। তুরাগকে একটি ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করার আবেদনের জবাবে এই রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

এনআরসিসি প্রধান বলেন, সারাদেশে ৪৯,১৬২ জনের নামে নদী দখলের অভিযোগ রয়েছে।

নদী কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে ঢাকার ৪৭টি খাল জরিপ করা হয়েছে। জরিপকালে সবগুলো খালে অবৈধ দখলদারিত্ব দেখা যায়। অন্তত ১১টি জলাশয়ের ওপর রয়েছে সুউচ্চ ভবন।

এতে আরও বলা হয়েছে, রিয়েল এস্টেটের বালি ভরাটের কারণে হারিয়ে গেছে ভাটারা, ডুমনি-কাঁঠালদিয়া, জোয়ার সাহারা এবং কাঠালদিয়া খালগুলো। ধোলাই খালের পানির প্রবাহ গেন্ডারিয়ায় একটি কালভার্ট দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে গেছে। এছাড়াও, অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি চলে যাচ্ছে কল্যাণপুর, হাজারীবাগ এবং কালুনগর খালে।

কমিশন জানিয়েছে, বালু, ধলেশ্বরী, মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার- এ পাঁচটি নদীর উপরও তারা জরিপ চালিয়েছে এবং প্রতিবেদনে এর ফলাফল বলা হয়েছে। কমিশন সারাদেশে সব মিলিয়ে ৪৮টি নদীর সমীক্ষা করবে বলেও জানিয়েছে।

প্রতিবেদন মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনও দেশের সমস্ত প্লাবনভূমি শনাক্ত করতে পারেনি। এর কারণে বিনা বাঁধায় চলছে কলকারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অবৈধভাবে জমি বরাদ্দ।

নদীর বুক থেকে অবৈধ অবকাঠামো অপসারণ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া উচিত বলেও প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।

বালু নদী

বালু নদী দখলকারীদের তালিকায় রয়েছে অসংখ্য নাম।

উদাহরণস্বরূপ, স্বনামধন্য একটি খাদ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানি রাজধানীর গুলশান এলাকায় নদীটি দখল করে একটি পোশাক কারখানা স্থাপন করেছে। রিপোর্টে বলা হয়, অবৈধভাবে শতশত অবকাঠামো তৈরি করে ডেমরা এলাকায় নদীটি দখল করা হচ্ছে।

টঙ্গীর পাগর এলাকায় নদীটি দখল হয়ে আছে চারটি পোশাক কারখানা, একটি রাসায়নিক কারখানা, একটি এলইডি বাল্ব তৈরির কারখানা এবং একটি ইস্পাত কারখানা দ্বারা। রূপগঞ্জে নদী দখল করে তিনটি আবাসিক প্রকল্প এবং একটি ইটের ভাটা গড়ে তোলা হয়েছে।

গাজীপুরের নাগরী ইউনিয়নে বালু নদী পাঁচ জায়গায় দখল করা হয়েছে। দখলকৃত স্থানে বেশ কয়েকটি পোল্ট্রি ফার্ম, স মিল, এমনকী একটি সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সীমানাও তৈরি করা হয়েছে।

টঙ্গী এবং রূপগঞ্জে শিল্পবর্জ্য সরাসরি নিঃসৃত হয় নদীতে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজধানীর রামপুরায় ওয়াসার পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের একটা লাইনের সঙ্গে সরাসরি নদীর সংযোগ আছে।

গাজীপুরের কালীগঞ্জে অপরিশোধিত বর্জ্য নিষ্কাশনের ফলে নদীর পানির রঙই এখন বদলে গেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “নদীর পানির রঙ স্বাভাবিক নয়। পানি দুর্গন্ধযুক্ত এবং মাছ কিংবা অন্যান্য জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য তা অত্যন্ত ক্ষতিকর।’

ধলেশ্বরী

মানিকগঞ্জের সিংগাইর এবং ঢাকার ধামরাই উপজেলায় ধলেশ্বরী নদীর আশেপাশে অন্তত ১০টি এলাকায় শিল্পকারখানাগুলো তাদের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ধলেশ্বরী এবং বালু নদীতে দূষণের মাত্রা এতো বেশি যে নদীর পানি ব্যবহারকারীরা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এবং ত্বকের বিভিন্ন ধরণের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

ধলেশ্বরীর দখলদারদের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। মাদারীপুরের শিবচরের তালেবপুর ইউনিয়নে, নদী দখল করে একটি স্টিল মিল তৈরি করা হয়েছে।

সিংগাইরের বায়রা ও ধল্লা ইউনিয়নে নদীর উপর শত ডেসিমাল এলাকাজুড়ে ইটভাটা গড়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মধুমতি

গোপালগঞ্জের হরিদাসপুরে ফারনেস তেল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্জ্য ফেলা হয় মধুমতি নদীতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে নদী দখল করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে।

নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় ২৮টি ইটভাটা তাদের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে।

এদিকে, দূষণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির লবণাক্ততা বেড়ে যায়। ফলে স্থানীয়দের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে নদীর পানি।

মধুমতি নদী ৩৮টি স্থানে দখল করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গোপালগঞ্জের পাচুরিয়া খালের উৎসমুখে জেলা প্রশাসন নিজেই একটি মার্কেট নির্মাণ করেছে’।

এতে আরও বলা রয়েছে, নদীর উপর সেতু নির্মাণের সময় নদীরই একটি অংশ আটকে বিকল্প রাস্তা বানানো হয়। যার ফলে, বাওরের সঙ্গে নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এভাবে ৩৪টি স্থানে মধুমতি নদীর সঙ্গে এর উপনদী এবং শাখানদীর সংযোগে বিঘ্ন ঘটছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলী ইউনিয়নে অবৈধভাবে নদী দখল করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি ব্যারাক স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জলিরপাড় ইউনিয়নে নদীর বেশিরভাগ অংশ রয়েছে চাল-কলের দখলে।

আড়িয়াল খাঁ

জরিপে দেখা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদীর মাঝখানে অবৈধভাবে জমি দখল করে একটি সরকারি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকার মেরিটাইম ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে নদীটি দখল করেছে।

পৌর এলাকার মধ্যে নদী দখল করে বেশ কয়েকটি স মিল এবং বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে।

জেলার শিবচর উপজেলায় নদীর একটি অংশ ভরাট করে একটি সেতু তৈরি করেছিলো স্থানীয় একটি কর্তৃপক্ষ। রিপোর্টে আরও বলা হয়, মাদারীপুর সদর, শিবচর ও কালকিনি উপজেলায় ১০টি ইটের ভাটা রয়েছে নদীটি দখল করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আড়িয়াল খাঁর একটি শাখা, বিল পদ্মা দখল করে তৈরি করা হয়েছে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, স্থানীয় মেয়রের বাড়ি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও দমকল বাহিনীর কার্যালয়।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top