ট্রাক, ট্রাক্টর ও ৪ মাসের খাবার নিয়ে রাস্তায় কৃষক, বিব্রত মোদি সরকার | The Daily Star Bangla
০৭:৩৫ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ০১, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৮:৪৬ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ০১, ২০২০

ট্রাক, ট্রাক্টর ও ৪ মাসের খাবার নিয়ে রাস্তায় কৃষক, বিব্রত মোদি সরকার

সুচিস্মিতা তিথি

ভারতে বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লির সীমান্ত। ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে কয়েক লাখ কৃষক দিল্লি ঘেরাও করেছেন।

নিজেদের ট্রাক এবং ট্রাক্টর-ট্রলি, যেগুলো সাধারণত ফসল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয় সেসব নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন আন্দোলনকারী কয়েক লাখ কৃষক। তারা কয়েক মাসের রেশনসহ দাবি আদায়ের সংকল্প নিয়েই দিল্লির পথে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে।

পাঞ্জাব রাজ্যের প্রবীণ কৃষক ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের (ক্রান্তিকরি গ্রুপ) এর প্রধান সুরজিৎ সিং ফুল বলেন, ‘আমরা আমাদের সাথে চার মাসের রেশন- আটা, শাকসবজি, খাবার তেল ও মশলা নিয়ে এসেছি।’

পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের কৃষকদের ৩২টি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে একজন সুরজিৎ সিং।

দিল্লি সংবাদদাতা জানান, তীব্র শীতের মধ্যে এই দুই রাজ্যের কৃষকরা হরিয়ানার সঙ্গে দিল্লির সীমান্তের দুই প্রবেশমুখ টিকরি ও সিংহুতে অবস্থান নিয়েছেন।

কৃষকদের বিক্ষোভ মিছিল আটকাতে প্রাথমিকভাবে হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশ সরকারের নির্দেশে পুলিশি ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছিল। আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। তবে, প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যারিকেড ভেঙে কৃষকরা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।

কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দিল্লি অবরোধের মুখে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আন্দোলনকারী কৃষকদের বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। স্থান পরিবর্তন করলে সরকার কৃষকদের ‘প্রতিটি সমস্যা ও দাবি’ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি।

তবে, শর্ত প্রত্যাখ্যান করে দিল্লির পাঁচটি প্রবেশমুখ অবরোধের কথা জানিয়েছে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা।

কৃষি আইনে কৃষকদের কোনো ক্ষতি হবে না বলে কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নতুন আইনের ফলে কৃষকরা দেশের ও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভালোভাবে ঢুকতে পারবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি, বিরোধী দল কৃষকদের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মোদি।

মোদির ওই বক্তব্যে বিক্ষোভকারীরা এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

আন্দোলন জোরদার করতে সারা দেশে কৃষকদের একত্রিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিক্ষোভকারী কৃষকরা। ইতোমধ্যে আন্দোলনে অংশ নিতে উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের কয়েকশ কৃষকও টিকরি ও সিংহুর দিকে এগুতে শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের (কাদিয়ান গোষ্ঠী) নেতা হরমিত সিং কাদিয়ান জানান, পাঞ্জাবের ফার্ম ইউনিয়নগুলো টিকরি ও সিংহুতে অবস্থানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং রাজধানীর অন্যান্য সীমান্তেও অবরোধ করা হবে।

এদিকে, কৃষক আন্দোলনের মুখে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অমিত শাহ। দিল্লি সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দিল্লি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, টিকরি ও সিংহুসহ অন্য তিনটি প্রবেশ পয়েন্টে আধা সামরিক বাহিনীর ১২টি কোম্পানি ও দিল্লি পুলিশ কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও অতিরিক্ত বাহিনীকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

পাঞ্জাবের কৃষক নেতা গুরনম সিং জানান, এই আন্দোলনকে 'দমন' করার জন্য আন্দোলনরত কৃষকদের বিরুদ্ধে ৩১টি মামলা করা হয়েছে।

কৃষকদের এই বিক্ষোভে পাঞ্জাবি শিল্পী গোষ্ঠীসহ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমর্থন জানিয়েছেন। ‘ট্রাক্টরটুটুইটার’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জানান।

সোশ্যাল মিডিয়া সেলেব্রিটি ভবজিৎ সিং বলেন, ‘আমরা পাঞ্জাবের পক্ষে কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে প্রোপাগান্ডা দমন করতে ও আন্দোলনের প্রচারের জন্য ২৫ হাজার নতুন টুইটার ব্যবহারকারীকে একত্রিত করব।’

আম আদমি পার্টির সাবেক আইনপ্রণেতা ধর্মভিরা গান্ধী সব পাঞ্জাবিকে কৃষকদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা প্রতিহত করতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার আহ্বান জানান।

গত সেপ্টেম্বরে চরম আপত্তির পরেও কৃষিসংস্কার নিয়ে তিনটি বিল ভারতের পার্লামেন্টে পাস হয়। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ বিল তিনটি সই করলে সেগুলো আইনে পরিণত হয়।

ওই তিনটি আইনের একটির অধীনে সরকার ন্যায্যমূল্যে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কেনা বন্ধ করে দিতে পারবে। যার ফলে পাইকারি বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। তাদের ভয়, ওই আইনের ফলে ফসলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বড় বড় ব্যবসায়ী ও কোম্পানির হাতে চলে যাবে।

শুরুতে সরকার পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছিল। পরে শক্তি প্রয়োগের পথ থেকে সরে আসে। এরপর কৃষকদের বিক্ষোভ দেখাতে দিল্লির বুরারির মাঠে যেতে বলা হলে আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে।

এর প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনরত একজন কৃষক সরবজিৎ সিং বিবিসিকে বলেন, ‘পাঞ্জাব থেকে লাঠি-জলকামান অনেক কিছু সহ্য করে আমরা এতদূর এসেছি। সরকার বলছে আমাদের চুপচাপ গিয়ে বুরারি ময়দানে বসে পড়তে, যেটা কিছুতেই আমরা মানব না। তাহলে আমাদের এই আওয়াজ চাপা পড়ে যাবে। আমরা চাই দিল্লির পানি-দুধ-ফল-সবজি সরবরাহের লাইন বন্ধ করে দিতে, যাতে সরকারের ওপর চাপ বাড়ে ও তারা আমাদের কথা শুনতে বাধ্য হয়।’

পর্যবেক্ষকদের আশংকা, কৃষক আন্দোলন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই সবজির বাজারে দাম বাড়তে পারে।

আন্দোলনকারীদের মধ্যে একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গতকাল মারা গিয়েছেন। গত সপ্তাহে কৃষকদের দিল্লি অভিমুখে যাত্রা শুরুর পর এটি দ্বিতীয় মৃত্যু।

এদিকে আজ কৃষক আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন ভারতের তিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

এনডিটিভি জানায়, সন্ধ্যায় ওই বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র তোমার একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি কৃষক নেতা ও প্রতিনিধিদেরও কমিটিতে রাখা হবে বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারী কৃষক প্রতিনিধিরা বলেন, ‘এখন কোনও কমিটি গঠনের সময় নেই।’

ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের নেতা রূপ সিং এনডিটিভিকে বলেন, ‘আমরা সরকারের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব মানি না। আমরা সরকারের কাছে কৃষি সংস্কারের ওই আইন বাতিল করার দাবি জানাই। সরকার বল প্রয়োগ করলেও আমরা পিছিয়ে যাব না। আমাদের প্রতিবাদ চলবে।’

আগামী ৩ ডিসেম্বর কৃষক নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ

ভারতে চলমান কৃষক বিক্ষোভের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো।

মঙ্গলবার গুরু নানকের ৫৫১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক অনলাইন আলোচনায় তিনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষায় সবসময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। কানাডার জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং শিখ ধর্মের অনুসারী। দেশটির মূলধারার রাজনীতিতেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।

কৃষক বিক্ষোভের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘আমরা সবাই পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে খুবই উদ্বেগে আছি। আমি জানি এই বাস্তবতা আপনাদের অনেকের। আপনাদের স্মরণ করিয়ে দেই, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষায় কানাডা আপনাদের পাশে থাকবে।’

এনডিটিভি জানায়, ট্রুডোর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নিন্দা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রিবাস্তব বলেন, ‘ভারতের কৃষকদের নিয়ে কানাডার নেতার দুর্বল বোঝাপড়ার মন্তব্য আমরা দেখেছি। এ ধরনের মন্তব্য অযাচিত, বিশেষ করে তা যখন একটি গণতান্ত্রিক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে হয়ে থাকে।'

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top