একটি ইয়াবা পরিবার | The Daily Star Bangla
০১:৩৮ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৯ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০১:৫৬ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৯

একটি ইয়াবা পরিবার

গ্লাস অর্ধেক ভরা, না অর্ধেক খালি? যুক্তি-তর্কের জন্যে এটা খুব ভালো বিষয়। যেহেতু গ্লাসের অর্ধেক অংশে পানি আছে, সেহেতু প্রথমে ‘ভরা’ প্রসঙ্গে আসি। কথা বলছি ইয়াবা চোরাচালানিদের নিয়ে। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় মাথায় ঘুরছে। সেটা হলো কোনো কোনো গণমাধ্যম লিখছে ‘ইয়াবা কারবারি’ বা ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী’। ব্যকরণবিদ নই, সেই বিবেচনায় ভুল বা শুদ্ধ বিচার করছি না। সাধারণ ধারণার বিষয় নিয়ে কথা বলছি।

ইয়াবা একটি ভয়ঙ্কর মাদক। মিয়ানমার থেকে অবৈধ উপায়ে ইয়াবা বাংলাদেশে আনা হয়। সহজ বাংলায় চোরাচালানের মাধ্যমে ইয়াবা বাংলাদেশে আনা হয়। যারা আনে তারা চোরাচালানি। কোনো বৈধ পণ্য বৈধভাবে আমদানি বা কেনা-বেচা যারা করেন, তারা ব্যবসায়ী। চোরাচালানি আর ব্যবসায়ী এক বিষয় নয়। সুতরাং ইয়াবা কারবারি লিখলে, চোরাচালানিদের ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়া হয়। যা প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্যে অসম্মানজনক। ১০২ জন ইয়াবা চোরাচালানি বা চোরা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছে, ইয়াবা কারবারি বা ব্যবসায়ী নয়।

এবার অর্ধেক ভরা গ্লাস প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

তালিকাভুক্ত প্রায় দুই হাজারের মধ্যে ১০২ জন ইয়াবা চোরাকারবারি অন্তত আত্মসমর্পণ করেছে। দীর্ঘ বছর ধরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। টেকনাফ-কক্সবাজারে অবাধে বিচরণ করেছে এসব চোরাকারবারি। শুধু মাদক বা ইয়াবা চোরাকারবারি নয়, এরা আরও নানারকমের সামাজিক অপকর্ম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ১০২ জনের মধ্যে ১২ জন আছে একটি পরিবারের সদস্য। সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ইয়াবা চোরাকারবারিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এক ও দুই নম্বরে নাম ছিল আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি ও তার আপন ভাই মৌলভি মজিবুর রহমানের। বাংলাদেশকে যে ইয়াবায় পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে, তার একক অবদান সাবেক এমপি বদির পরিবারের। সেই প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পরিবারের ১২ জন ইয়াবা চোরাকারবারিকে আত্মসমর্পণ করাতে পারা, একটা বড় অগ্রগতি।


Bodi Gong
ছবি: সংগৃহীত

এবার আসি গ্লাসের অর্ধেক খালি প্রসঙ্গে।

সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি সব সময় বলেছে, তিনি বা তার পরিবার ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত নয়। মাদকবিরোধী অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে বদির এক বিয়াই নিহত হয়। সেই নিহত ব্যক্তি যে বিয়াই, বদি তাও স্বীকার করেনি।

সরকারের তালিকা অনুযায়ী বড় ইয়াবা চোরাকারবারি আছে ৭৩ জন। তাদের ৩০ জন আত্মসমর্পণ করেছে। এই ৩০ জনের মধ্যে আছে সাবেক এমপি বদির চার ভাই আবদুল শুক্কুর, আবদুল আমিন, মো. শফিক ও মো. ফয়সাল, বদির ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল, ভাগনে সাহেদুর রহমান নিপুসহ ১২ জন। যদিও কোনো কোনো সংবাদে এই সংখ্যা ১৪ বা ১৬ উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকার এক নম্বরে থাকা বদিকে ইয়াবা চোরাকারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অঘোষিত সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বদি নিজে আত্মসমর্পণ করেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার দুই নম্বরে থাকা বদির আপন ভাই মৌলভি মজিবুর রহমানও আত্মসমর্পণ করেনি।

বদি, তার ভাই-ভাগ্নেসহ পরিবারের এসব সদস্য যে ইয়াবা চোরাকারবারি, তা সুনির্দিষ্ট করে বহুবার গণমাধ্যমে লেখা হয়েছে।

একথা অজানা নয় যে, টেকনাফের প্রশাসন চলে বদির নির্দেশনা অনুযায়ী। সেই প্রশাসনের করা ইয়াবা চোরাকারবারিদের তালিকায় বারবার উঠে এসেছে বদি, তার ভাই-ভাগ্নেসহ পরিবারের সদস্যদের নাম। সব সময়ই বদি সরকারের উচ্চ মহলের সহায়তা পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মাদকবিরোধী সপ্তাহ উদ্বোধন করেছেন বদিকে সঙ্গে নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে তালিকা করেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই তালিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। আরও সতর্কভাবে তালিকা করার নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন ‘বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে প্রমাণ নেই’। প্রায় একই রকমের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। টেকনাফ-কক্সবাজার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একটা অংশ বারবার অভিযোগ করে বলেছেন, উচ্চমহলের পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগে বদি তো বটেই, বদির ভাই-ভাগ্নেসহ আত্মীয় স্বজনরা অবাধে ইয়াবা চোরাকারবারিদের নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রকাশ্যে অবস্থান করেছে। প্রশাসন তাদের প্রতিপক্ষ হয়নি বা প্রশাসনের সহায়তায়ই চোরাকারবার চালিয়ে গেছে। এমপি বদির ক্ষমতায় তারা ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মঞ্চেও সেই দাপটের প্রমাণ মিলেছে। বদির  ফুফাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল গণমাধ্যমকর্মীদের হুমকি দিয়ে বলেছে, ‘আত্মসমর্পণের পর তোদের মজা দেখাব। ইয়াবা ব্যবসায়ীর হাত অনেক লম্বা।’

একথা অনুষ্ঠানস্থলের সামনের দিকে থাকা সবাই শুনেছেন। মঞ্চে থাকা মন্ত্রী, প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তা না শোনার কথা নয়। একজন ইয়াবা চোরাকারবারির এমন দাম্ভিকতার বিষয়ে তারা সবাই চুপ থেকেছেন।

যেহেতু বদির পূর্বপুরুষ মিয়ানমার থেকে এসেছে, সেকারণে মিয়ানমারে বদির আত্মীয়-স্বজন আছে। বলা হয় তাদের পরিবারের ইয়াবা তৈরির কারখানা আছে মিয়ানমারে। মিয়ানমারে কোনো সমস্যা হলে, বদির ইয়াবা চোরাকারবারি স্বজনরা বাংলাদেশে চলে আসে। বাংলাদেশে সমস্যা হলে বদির স্বজনরা মিয়ানমারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ইয়াবা চোরাকারবারে কখনো তাদের তেমন কোনো সমস্যা হয় না। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও দুই দেশের সম্মিলিত ইয়াবা সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষক। বাংলাদেশ থেকে বড় ইয়াবা চোরাকারবারিরা সহজেই মিয়ানমারে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারে।

মাদক বিরোধী অভিযানের সময় বদি চলে গিয়েছিল ওমরাহ করতে সৌদি আরব। তার ইয়াবা চোরাকারবারি স্বজনরা আশ্রয় নিয়েছিল মিয়ানমারে। এতোদিনের যে অভিযোগ, তা প্রমাণ হলো আত্মসমর্পণের ঘটনায়। দৃশ্যমান হলো, একটি ইয়াবা চোরাকারবারি পরিবার। যে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য প্রত্যক্ষভাবে ইয়াবা চোরাকারবারি। সেই পরিবারের প্রধান ব্যক্তি বা মুরব্বি সাবেক এমপি আব্দুর রহমান বদি। যিনি আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার সমন্বয়কারী।

এখন প্রশ্ন দু’টি।

এক. তারা কেন আত্মসমর্পণ করল?

দুই. এর মধ্য দিয়ে ইয়াবা চোরাকারবার বন্ধ হবে কিনা?

মাদকবিরোধী অভিযানে ছোট ইয়াবা চোরাকারবারিরা নিহত হওয়ার ঘটনায় কিছুটা ভীত হয়ে পড়ে বড় চোরাকারবারিরা। প্রশাসনের একটা অংশ যেমন তাদের পক্ষে, বিপক্ষেও একটি অংশ আছে। অভিযানের মুখে যে যেখানে পারে পালিয়ে যায়। ইয়াবা চোরাকারবার করে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে, বিশাল বিশাল বাড়ি তৈরি করেছে টেকনাফে। কিন্তু, সেই বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে না। সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আত্মসমর্পণ করলে সম্পদ রক্ষা করা যাবে, এটা একটা কারণ হতে পারে। আত্মসমর্পণ করলেও গোপনে ইয়াবা চোরাকারবার চালিয়ে যাওয়া যাবে তেমন কোনো সমস্যা হবে না, তাও হয়ত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পরামর্শও হয়ত এক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে। আবার মানুষ জানবে, তারা এখন আর ইয়াবা চোরাকারবারি নয়। ভালো হয়ে গেছে।

বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছে বদির পরিবার। কিন্তু এমপি হওয়ার পরও পরিচিতি ‘ইয়াবা চোরাকারবারি পরিবার’। এবার নিজে মনোনয়নও পায়নি, স্ত্রী এমপি হয়েছে। সামনে সম্ভবত আরও অনেক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে তাকে ও তার পরিবার নিয়ে গণমাধ্যমের সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না। ইয়াবা চোরাকারবারি পরিচয় ঘোচানোর জন্যে অন্যদেরসহ নিজের পরিবারের সদস্যের আত্মসমর্পণ করানোর উদ্যোগ নিয়েছে বদি। তবে, সতর্কতার সঙ্গে নিজে এবং আপন ভাই আত্মসমর্পণের বাইরে থেকেছে। এখন হয়ত বলতে পারবে, আমি বা আমার আপন ভাই ইয়াবা চোরাকারবারি নই।

ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে শত বা হাজার কোটি টাকার হিসাব। এর অংশীজন সীমান্ত পাহারা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ কক্সবাজার-টেকনাফ প্রশাসনের বড় একটি অংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার সংবাদও জানা গেছে বিভিন্ন সময়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটা অংশই শুধু নয়, বিএনপি-জামায়াতের অনেকে ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সারাদেশে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও, ইয়াবা চোরাচালনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক।

প্রশাসনের সম্পৃক্তদের সনাক্ত বা ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তালিকার প্রধান দুইজন বদি ও তার আপন ভাই আত্মসমর্পণ করেনি। তালিকাভুক্ত আরও প্রায় দের হাজার ইয়াবা চোরাকারবারি রয়ে গেছে। এর বাইরেও আরও অনেক ইয়াবা চোরাকারবারি আছে। মিয়ানমারে অবস্থানরত সিন্ডিকেট তো আছেই। আজকেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, ইয়াবা আসছেই। ফলে আর যাই হোক একথা বলা যাচ্ছে না যে, আংশিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ইয়াবা চোরাকারবারের অবসান ঘটছে বা ঘটবে।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top