রকস মিউজিয়াম সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা | The Daily Star Bangla
১১:০৭ পূর্বাহ্ন, মে ১৮, ২০২১ / সর্বশেষ সংশোধিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ন, মে ১৮, ২০২১

আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস

রকস মিউজিয়াম সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

অতীত সবসময় ভবিষ্যতের ভিত্তিভূমি। ইতিহাসের পরিণতি হচ্ছে বর্তমান। তাই আমরা বারবার অতীত খুঁজে বেড়াই৷ অতীত লিপিবদ্ধ থাকে ইতিহাসের পাতায় আর প্রদর্শিত হয় জাদুঘরে। জাদুঘরে যে পুরনো বস্তুগুলো প্রদর্শিত হয় সেগুলো প্রত্যেকটি ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে, গল্প বলে সংস্কৃতির, ঐতিহ্যের৷ একারণেই জাদুঘর একটি দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রতিষ্ঠান। আজ ১৮মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। জাদুঘরের গুরুত্ব অনুধাবন করে International Council of Museum (ICOM) ১৯৭৭ সাল থেকে প্রত্যেক বছর এই দিবসটি পালন করে আসছে৷

বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জাদুঘর হলো পঞ্চগড়ে অবস্থিত ‘রকস মিউজিয়াম’। বাংলাদেশের একমাত্র জাদুঘর যেটি এ অঞ্চলে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের শিলা সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে৷ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘরটি। ১৯৯৭ সালের ১ মার্চ পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হকের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে এই জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি পঞ্চগড়ের বিভিন্ন স্থানে কিছু ভিন্নধর্মী পাথরের উপস্থিতি লক্ষ‍্য করেন। এ অঞ্চলটি মূলত সমভূমি অঞ্চল। পার্বত্য ভূমি না থাকার কারণে ধরে নেওয়া যায় যে, এই পাথরগুলো অন্য কোনো অঞ্চল থেকে এসেছে। পঞ্চগড়ের উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা অবস্থিত। পঞ্চগড় জেলাকে হিমালয় কন্যা বলে একারণেই অভিহিত করা হয়। উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং জেলা সীমান্ত হিসেবে এ জেলাকে বেষ্টিত করে রেখেছে। ভারতের এই অঞ্চলগুলোর ভূমিরূপে নানা ধরনের শিলা পাওয়া যায়, বিশেষ করে হিমালয় পর্বতমালা অঞ্চলে। পঞ্চগড় জেলাকে বেষ্টিত করে রেখেছে তিনটি বড় নদী- করতোয়া, মহানন্দা এবং তিস্তা৷ এছাড়াও রয়েছে প্রায় ২০টি ছোট নদী। এই নদীগুলোর উৎপত্তি হয়েছে হিমালয় বেল্ট, ভুটান, সিকিম এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে৷ এ অঞ্চলে প্রাপ্ত সেই বৃহদাকার পাথরগুলো নদী দ্বারা বাহিত হয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে অথবা কারো দ্বারা এখানে এসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রকৃতি কিংবা মানুষের প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে এই পাথরগুলোর সাথে৷ সেই গুরুত্বকে অনুধাবন করে তিনি সেই শিলাখন্ডগুলোকে সংরক্ষণ করা শুরু করেন।

‘রকস মিউজিয়াম’ নামটি শুনেই মাথায় আটকে যায় ‘রকস’ শব্দটি৷ রকস শব্দের অর্থ ‘শিলা’। এখানে বিভিন্ন ধরনের শিলা এবং শিলাখন্ড সংরক্ষিত রয়েছে৷ শিলা প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত- আগ্নেয় শিলা, পাললিক শিলা এবং রূপান্তরিত শিলা। রকস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত শিলাগুলোর মধ্যে তিন ধরনের শিলাই আছে। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রানাইট, বেলেপাথর, চুনাপাথর, সিস্ট, সিলিকা প্রভৃতি। এখানে সংরক্ষিত শিলাগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নাজমুল হক এবং নাজিবা সাইয়ারা তাদের ‘Rocks Museum: A Key for Uncloaking Ancient Human Habitation’  গ্রন্থে শিলাগুলোকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন- পরিবেশগত শিলা, প্রত্নতাত্ত্বিক শিলা, নৃতাত্ত্বিক শিলা এবং জাতিতাত্ত্বিক শিলা।

সেগুলোর মধ্যে পরিবেশগত শিলা বলতে বিভিন্ন উপাদানে তৈরি আগ্নেয়, পাললিক এবং রূপান্তরিত শিলাকে বোঝানো হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক শিলা বলতে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যবহার্য শিলাখন্ডকে বোঝানো হয়েছে- যেগুলো দ্বারা প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বোঝা সম্ভব। যেমন- সমাধি কিংবা বিভিন্ন স্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত শিলাখন্ড দ্বারা নির্মিত পাথরের স্লাব প্রভৃতি। নৃতাত্ত্বিক শিলা বলতে মানুষের ব্যবহারের প্রত্যক্ষ প্রমাণ বহন করে এমন নিদর্শন যেমন বিভিন্ন আকৃতি দিয়ে কাটা শিলা যেগুলো কোনো বৃহৎ শিলার অংশ হতে পারে৷ এছাড়াও পাথরের তৈজসপত্র, পাথরের হাতিয়ার, বিভিন্ন ধরনের চিত্র বা সংকেতযুক্ত শিলাখন্ড৷ রকস মিউজিয়ামে বিভিন্ন ধরনের পাথর এবং পাথরের তৈরি উপাদান ছাড়াও রয়েছে দুটি বৃহৎ শালকাঠের নৌকা। ধারণামতে সেগুলো প্রায় হাজার বছরের পুরনো। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, ভিতরগড় প্রত্নস্থান থেকে পাওয়া বিভিন্ন ধরনের প্রত্ননির্দশন যেমন ইট, এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া মুর্তি, বাঁশের তৈরি নিদর্শন প্রভৃতি।

বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এ অঞ্চলে পাথরের নিদর্শন তেমন পাওয়া যায়না। বিভিন্ন স্থাপনায় ইট, সুড়কির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়৷ তদুপরি, পাথরের যে নিদর্শনগুলো পাওয়া গিয়েছে সেগুলোও সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি বললেই চলে৷ অথচ এই ভিন্নধর্মী রকস মিউজিয়ামটি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ৷ রকস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পাথরগুলো নব্যপ্রস্তরযুগের প্রমাণ বহন করছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠাতা নাজমুল হক। অনেকগুলো পাথর পাওয়া গেছে ভিতরগড় এলাকায়, ধারণা করা হয় যে সেগুলোও অনেক পুরনো। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু পাথর সেতু নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে৷ এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পাথরের ব্যবহার লক্ষণীয়। বিভিন্ন পাথরের গায়ে জ্যামিতিক নকশা, তীর ধনুক, মানুষের চোখ ইত্যাদি অঙ্কিত রয়েছে৷ এছাড়াও কিছু কিছু সংকেত নেপালি, ব্রাহ্মি এবং চিনা লিপির সাথে সাদৃশ্য রয়েছে বলে নাজমুল হকের পূর্বোক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে৷ অন্যদিকে, পাথরের হাতিয়ার নিঃসন্দেহে প্রাগৈতিহাসিক পাথরের সংস্কৃতির পরিচয় বহন করছে৷ এখানে সংরক্ষিত অনেক পাথরের সাথে অতীত মানুষের ধর্মীয় রীতির সংশ্লিষ্টতা থাকার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়া যায় না। পাশাপাশি, এই নিদর্শনগুলো হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের পরিচয় বহন করতে পারে।

অন্যদিকে, এই জাদুঘরে দুটি বৃহৎ শালকাঠের নৌকা সংরক্ষিত রয়েছে। যদিও এগুলোর আকার ও আকৃতি বর্তমান বাংলাদেশে প্রাপ্ত নৌকার সাথে মেলে না। ধারণা করা যেতে পারে যে, সেগুলো আদিবাসীদের দ্বারা নির্মিত ও ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ, রকস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত প্রত্ননির্দশন গবেষণার মাধ্যমে এই অঞ্চলের ইতিহাসকে নতুন করে বিনির্মিত হতে পারে- যেগুলো মানুষের অতীত সংস্কৃতির পরিচয় বহন করছে৷

বর্তমানে মিউজিয়ামটি পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অধীনে৷ মিউজিয়াম পরিচালনার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে থেকে ৫ টাকা করে নেয়া মিউজিয়াম ফি বাবদ নেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া বর্তমানে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে প্রবেশমূল্য নেয়া হয়। মূলত সেই অর্থ দিয়েই জাদুঘরের আনুষঙ্গিক ব্যয় পরিচালিত হয়। জাদুঘরটির পরিচালনার ভার বিভিন্ন শিক্ষকের উপর থাকে বিভিন্ন সময়। নির্দিষ্ট কোনো পেশাদার ব্যক্তির উপর এর সংরক্ষণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব নেই৷ দুইতলা একটি ভবন জাদুঘরের জন্য নির্মিত হলেও ভবনের নিচতলা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ এছাড়াও বহুমূল্যবান অনেক পাথর কলেজ প্রাঙ্গণে উন্মুক্তভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে৷ জাদুঘরে প্রত্ননির্দশনগুলো প্রদর্শনের জন্য শো কেস ব্যবহৃত হয়েছে  কিন্তু সেগুলোর দশা বেহাল৷ কোনো ধরনের পেশাদার প্রদর্শনী ব্যবস্থা সেখানে লক্ষ্য করা যায় না। নির্দশনগুলোর লেবেলিং সঠিকভাবে করা নেই৷ ফলে, গবেষক এবং সাধারণ দর্শনার্থীর পক্ষে এগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝা সম্ভব নয়। এটি বিশেষ করে ঘটেছে জাদুঘরের অভ্যন্তরে সংরক্ষিত পাথরগুলোর ক্ষেত্রে৷ নিদর্শনগুলো যেভাবে সাজানো তাতে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা মনে হয়। জাদুঘর কক্ষের ওপরে তিন পাশে এমনভাবে ভ্যান্টিলেটর লাগানো যেগুলোতে আলো বিপরীত পার্শ্বের শোকেসের কাঁচে প্রতিফলিত হয়ে সেই শোকেসের নির্দশন দেখা অসম্ভব করে দিয়েছে। প্রত্নবস্তু সবসময় প্রাচীন হয়ে থাকে তাই তাদের সংরক্ষণ করা উচিত খুবই সচেতনভাবে। কিন্তু এখানে এমনভাবে নিদর্শনগুলো সংরক্ষিত হয়েছে তাতে খুব শিগগির নষ্ট হবার আশঙ্কা রয়েছে।

‘আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস ২০২১’- এর প্রতিপাদ্য হলো ‘The Future of Museums: Recover and Reimagine’। সেই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রকস মিউজিয়াম- এর Recover এর ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সেগুলো হলো: জাদুঘরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে আসা, একজন কিউরেটর নিযুক্ত করা, প্রত্ননির্দশনসমূহের ডকুমেন্টেশন এর ব্যবস্থা করা, জাদুঘরের প্রত্ননিদর্শনসমূহ বৈশিষ্ট্য সাদৃশ্য অনুযায়ী শ্রেনিবিন্যাস করা, প্রত্ননির্দশনসমূহের লেবেলিং করা (সংক্ষিপ্ত অথচ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকতে হবে), শোকেসগুলো মেরামত করা এবং আলোর ব্যবহার দর্শনবান্ধব করা এবং গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমধর্মী জাদুঘরটিকে দর্শনার্থী-বান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথোপযুক্ত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একটি দেশের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির জীবন্ত প্রমাণ বহন করে একটি জাদুঘর৷ সেক্ষেত্রে জাদুঘর সম্পর্কে আর‌ও সচেতনতা সৃষ্টি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: উম্মে হালিমা শ্রাবনী, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

shraboniislam111@gmail.com

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top