মেকআপের চেকআপ দরকার | The Daily Star Bangla
১২:০৬ অপরাহ্ন, জুন ০৪, ২০১৯ / সর্বশেষ সংশোধিত: ১২:১০ অপরাহ্ন, জুন ০৪, ২০১৯

মেকআপের চেকআপ দরকার

বাংলাদেশে আনাচে-কানাচে আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে বিউটি পার্লার। কী শহর আর কী গ্রাম- সব জায়গাতেই চোখে পড়বে বৌ সাজে সুন্দরী নারীর ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড। বাড়ির নিচতলা থেকে বড় শপিং মল। কোথায় নেই? জেলা বা উপজেলা- এমনকী কোনো কোনো অঞ্চলের ইউনিয়ন পর্যায়েও ছোট একটা বদ্ধ ঘরেও চলছে বিউটি পার্লার। বড় শহরের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল আয়োজনে চলছে তরুণীদের রূপসজ্জার কাজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা-রাত, মোটামুটি সপ্তাহে সাতদিন।

শুধু কি মেয়েরা? না, এখন ছেলেদেরও রূপসজ্জার দিকে ঝোঁক বেড়েছে।

বড় বড় শহরে এখন ছেলেদেরও আলাদা পার্লার হচ্ছে। গ্রামের বটতলার নরসুন্দরের দোকানের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে আধুনিক সব নাপিতেরা। একটা সময় নরসুন্দরের কাজ শুধুমাত্র নিম্নবর্ণের হিন্দুদের পেশা হলেও এখন মুসলমান ও খ্রিস্টান ধর্মের লোকজনও আসছেন এ পেশায়। এক সময় শুধু ছেলেদের পেশা হলেও এখন এটি মেয়েদেরও পেশা।

আজকের বিউটি পার্লারের শুরুর দিনগুলো কেমন ছিলো? নেট ঘেঁটে যা পেলাম তাতে চক্ষু ছানাবড়া। চলুন তা দেখি আসি।

ইতিহাসে দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে প্রাচীন মিশরে রূপ সজ্জার প্রচলন ছিলো। তখন নারী-পুরুষ সবাই তাদের চোখকে আকর্ষণীয় করতে সুরমা ব্যবহার করতেন।

প্রাচীন রোমে সমাজে বিত্তবান রোমান নারীদের তাদের গায়ের রং ফরসা করার জন্য বিশেষ ধরনের চক ব্যবহার করার ইতিহাস মেলে। ফ্যাকাসে রঙ ছিলো সমাজের উচ্চবিত্ত নারীদের অলংকার। কারণ, একমাত্র ধনীরাই তাদের দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরের ভিতরে কাটাতে পারতো যেখানে গরীব নারীদের সূর্যের তাপের নীচে কাজ করতে হতো। গায়ের রঙ পেইল বা ফ্যাকাসে করার জন্য এতোটাই বেপরোয়া হয়ে গেলো যে ষোড়শ শতকের দিকে ইউরোপের নারীরা বিশেষ কায়দায় শরীর থেকে রক্ত বের করে দিয়ে বির্বণ চেহারা করতেন।

প্রাচীন চীনে রূপসজ্জার অংশ হিসেবে নখে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার কো হতো। রঙের ভিন্নতা সমাজিক অবস্থানের প্রতীক ছিলো। যেমন, ধনীরা সোনালি রঙ ব্যবহার করতেন।

রানী ভিক্টোরিয়া রূপসজ্জাকে কুরুচিপূর্ণ বলে আখ্যা দেওয়ার আগ পর্যন্ত, রূপসজ্জাকে সমাজের অর্থ-বিত্তের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যারা পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত থাকতেন, তারা রূপসজ্জা করতেন।

মূলত বিশ শতকের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র শিল্প বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রূপসজ্জার ব্যাপক বিকাশ ঘটতে শুরু করে। চলচ্চিত্রের হাত ধরেই মেকআপ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় সারাবিশ্বে।

১৯০০ সালে এ্যানি টার্নবো নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা সর্বপ্রথম চুল সোজা করা, চুলের বৃদ্ধি এবং চুলের স্বাস্থ্যের জন্য লোশন বিক্রি শুরু করেন। তারপরে ১৯০৯ সালে এলিজাবেথ আর্ডেন সর্বপ্রথম ‘মেকওভার’ শব্দটির প্রচলন করেন এবং মেয়েদের সেলুনের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯১৩ সালে মাশকারা আবিষ্কার করেন মেবিলিন যা পরবর্তীতে তার ছোট বোন লিলি উইলিয়াম ব্যবসায়িক রূপ দেন। ১৯২০ সালে আইব্রো পেন্সিলের উন্নত রূপ আসে যার মাধ্যমে চিকন করে দাগ টানা যেতো। ১৯৩০ সালে বিখ্যাত ফ্যাশন আইকন কোকো চ্যানেল ট্যানিং অয়েলের প্রচলন করেন। ১৯৩৯ সালে জার্মান শাসক হিটলার মেকআপ নিষিদ্ধের চেষ্টা করেন কিন্তু, জার্মান নারীরা প্রতিবাদে কাজ না করার ঘোষণা দেন।

১৯৫০ সালে রঙিন চলচ্চিত্রের সূচনার সঙ্গে সঙ্গে মেকআপের রঙেরও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তখন বাহারি রঙের ব্যবহার শুরু হলো চলচ্চিত্রে।

কিন্তু, ১৯৭০ সালের দিকে মেকআপ ইন্ডাস্ট্রি একটা ধাক্কা খায়। সেসময় নারীবাদের উত্থানের ফলে নারীবাদীরা মেকআপকে যৌনতা এবং নারীকে ভোগবাদের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেন।

১৯৯০ সালের দিকে প্রসাধনী শিল্পের বিশাল বিকাশ ঘটে। নতুন নতুন কোম্পানি নিত্য-নতুন পসরা নিয়ে বাজারে আসতে থাকে। এবং এই সময়ই মুখের বলিরেখা বা বুড়িয়ে যাওয়ার কীভাবে রুখে দেয়া যায় সেধরনের প্রসাধনী বাজারে আসে। তারপরে শুধুই এগিয়ে যাওয়া।

কিন্তু, বাংলাদেশে পার্লারের যাত্রাটা শুরু হয় চায়নিজ নারী কার্মেল চ্যাং লিউ শেই এর হাত ধরে ১৯৬৩ সালে। শুরুর দিকে প্রচার না পেলেও ১৯৬৫ সালে পার্লারটি আত্মপ্রকাশ করে ‘মে ফেয়ার’ নামে। শুরুর দিকে শুধুমাত্র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও অভিজাত পরিবারের নারীরা আসতেন। পরে রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের স্ত্রীরাও এখান থেকে সৌন্দর্যসেবা নিতে শুরু করেন। তারপরে ১৯৭৭ সালে জেরিনা আজগর ‘লিভিং ডল’ নামে তার পার্লার শুরু করেন। ১৯৭০ সালে করাচি থেকে বিউটিফিকেশনের উপর কোর্স করেন তিনি। তার পথ ধরে ধীরে ধীরে সৌন্দর্যসেবার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন অনেকেই। বিশেষ করে সৌন্দর্যসেবা যে নারীর পেশা হয়ে উঠতে পারে তা জেরিনা আজগরই প্রথম প্রমাণ করেছেন। ১৯৮০-৮৫ সালের দিকেও ঢাকায় লিলি, লিসা ও নিলুর মোট তিনটি বিউটি সেলুন ছিলো। বর্তমানে বাংলাদেশ বিউটি পার্লার ওনারস অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সারাদেশে পাঁচ লাখের বেশি পার্লার রয়েছে।

পার্লার হয়েছে লাখ লাখ। সমাজের নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছে। বিশেষ করে, সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অর্থাৎ আদিবাসী নারীদের কর্মসংস্থান হয়েছে। হিজরা, প্রতিবন্ধী ও এসিড সন্ত্রাসের শিকার নারীরাও তাদের জীবিকার সন্ধান পেয়েছেন এই শিল্পের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ ম্যানুফেকচারার এসোসিয়েশনের মতে, গত ১৫ বছরে এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছে গড়ে প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে এবং ২০১৫ সালে বার্ষিক লেনদেন ছিলো ১৫০ বিলিয়ন টাকার মতো।

অতএব বোঝাই যাচ্ছে কী তরতর করে আমাদের এই শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। যে গতিতে এগিয়েছে সেভাবে কী আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পেরেছি? আমরা কী কাক্ষিত সেবা দিতে পারছি? হয় তো পারছি, হয়তো পারছি না।

তবে একথা বলাই যায় দেশের অন্য অনেক ব্যবসার মতো এখানেও অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য আছে। যার কারণে আমরা প্রায়ই দেখি ভ্রাম্যমাণ আদালত নামিদামি ব্র্যান্ডের বিউটি পার্লারকে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করছে। বিশেষ করে ঈদ মৌসুমে এধরনের প্রতারণা বেশি দেখা যায়।

এখনই সময় লাগাম টেনে ধরার, নজরদারি জোরদার করার। নতুবা সৌন্দর্য বর্ধনের প্রচেষ্টা রূপ নিবে সৌন্দর্য হরণে। এসিড সন্ত্রাসের চেয়ে কোনো অংশে কম ভয়াবহ নয় যদি মেয়াদ উত্তীর্ণ ও নিম্নমানের প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়।

সৌন্দর্যচর্চা এখন আর সৌখিন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রীতিমত পড়ালেখা করানো হয় এ বিষয়ে। রূপচর্চায় ভেজাল প্রসাধনী বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের সব নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের নকল এতোটা সুক্ষ্মভাবে করা হচ্ছে যে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায় নকলের ভিড়ে আসল পণ্য খুঁজে বের করা।

ভেজাল খাদ্য থেকে শুরু করে ভেজাল পোশাক, বাঙালির জীবনের সঙ্গে যেনো নিবিড়ভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সেখানে বিউটি পার্লার ভেজালের বাইরে থাকবে কেনো! থাকছেও না। তবে সুযোগ আছে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। এর জন্যে প্রয়োজন আন্তরিকতা ও সততা। বাধ্য না করলে ব্যবসায়ীরা সততার পরিচয় দিবেন, মনে হয় খুব বেশি আশা করা যায় না। উদ্যোগী হতে হবে সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের। রমজান মাসের ভেজালবিরোধী অভিযান দিয়ে তা সম্ভব নয়। একটি সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য-স্মার্ট নীতিমালার আওতায় আনা দরকার বিউটি পার্লার কেন্দ্রীক শিল্পকে। রূপচর্চা একটি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা। এর জন্যে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। এখন বাংলাদেশে লাখ লাখ বিউটি পার্লারে হাজার হাজার ‘রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ’। কার কী যোগ্যতা তা একেবারেই অজানা। জানি, সবাইকে এক কাতারে ফেলা যাবে না। এও জানি, ‘রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ’দের অধিকাংশেরই বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। অথচ, তারা কাজ করছেন মানুষের স্পর্শকাতর ত্বক নিয়ে। ব্যবহার করছেন ভেজাল ও নিম্নমানের প্রসাধনী।

রূপচর্চা কেন্দ্রিক এসব প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়েছে কুটির শিল্পের আকারে। কেউ কেউ তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বড় শিল্পের রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। এখন ‘নিয়ন্ত্রণমূলক’ মানসিকতা নিয়ে অভিযান চালিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে সুফল মিলবে না। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শিল্পটি আরো কীভাবে বিকশিত হতে পারে, প্রয়োজন তেমন একটি নীতিমালা।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top