ভাবমূর্তি ও খিচুড়ি সমাচার | The Daily Star Bangla
০৩:২৫ অপরাহ্ন, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৫:৩০ অপরাহ্ন, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

ভাবমূর্তি ও খিচুড়ি সমাচার

শাক দিয়ে যে মাছ ঢাকা যায় না, তা অজানা নয় প্রায় কারোরই। এদিক-সেদিক দিয়ে থালার মাছ ঠিকই দেখা যায়। ‘বিতরণ ব্যবস্থাপনা’ দিয়ে খিচুড়ি ঢাকার একটা চেষ্টা দৃশ্যমান হলো। কিন্তু, খিচুড়ি ঢাকা তো পড়লোই না, থালা উপচে পুরো শরীরে লেপ্টে গেল। পরিশেষে সেই বাক্যের কাছে আশ্রয়, এসব ‘বিএনপি-জামায়াত’ থেকে আসা সাংবাদিকদের কাজ। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা সরকারের ‘ভাবমূর্তি’র দিকে খেয়াল রাখে না।

‘পর সমাচার এই যে’ চিঠি লেখা যুগের একটি অতিব্যবহৃত শব্দ। এখন ভাবমূর্তি প্রসঙ্গে পর সমাচার এই যে, সরকারের ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ কারা করেন? সাংবাদিক বা গণমাধ্যম? না সরকারের অতিলোভী কিছু কর্মকর্তার কারণে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়?

খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশ সফরে যাওয়া সংবাদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। ব্যাখ্যার পরেই আবার বলেছেন, বিদেশ সফরে যাওয়া হবে না।

তারা বলেছেন, ৫০০ জন কর্মকর্তা ‘খিচুড়ি রান্না’ শিখতে নয়, রান্না করা খিচুড়ির ‘বিতরণ ব্যবস্থাপনা’র প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ সফরে যাবেন।

এখন দেখা যাক খিচুড়ি রান্না ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আসলে কেমন?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করছে সরকার। এটা সরকারের অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ। এই উদ্যোগটি প্রথম নিয়েছিল বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। প্রথমে কিছু বিদ্যালয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা পুষ্টি-মানসম্পন্ন বিস্কুট দেওয়া শুরু হয়। তারপর এই বিস্কুট পুষ্টিমান অক্ষুণ্ন রেখে দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ১০৪টি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার দেওয়ার কর্মসূচি চলছে। এরমধ্যে ১৬টি উপজেলার বিদ্যালয়ে সপ্তাহে তিন দিন বিস্কুট ও তিন দিন খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে। কাজটি করছে সরকার।

১৬টি উপজেলায় খিচুড়ি কার্যক্রম চালুর আগে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি তিনটি উপজেলায় খিচুড়ি রান্না-বিতরণের পাইলট প্রজেক্ট করে। যা সফল হয়। সরকারকে সম্পৃক্ত করেই এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর দুপুরের খাবার হিসেবে তিন দিন বিস্কুট এবং তিন দিন খিচুড়ি দেওয়ার। নেওয়া হয়েছে ১৯ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার ‘মিড-ডে মিল’ প্রকল্প। একনেক সভায় ‘মিড-ডে মিল নীতি’ পাসও হয়েছে।

৫০৯টি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক কোটি ৪৮ লাখ শিক্ষার্থী পাঁচ বছর দুপুরে খাবার পাবে। সপ্তাহে তিন দিন বিস্কুট এবং তিন দিন খিচুড়ি।

এই টাকা থেকেই পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে খিচুড়ি রান্না শিখবেন বা রান্না করা খিচুড়ি কীভাবে বিতরণ করবেন, তার প্রশিক্ষণ নেবেন ৫০০ সরকারি কর্মকর্তা। যদিও পাঁচ কোটি টাকা এক্ষেত্রে বড় বিষয় নয়। প্রশ্ন এসেছে ‘কেন’ এবং ‘নৈতিকতা’ নিয়ে।

এখন ১৬টি উপজেলায় সফলভাবে খিচুড়ি রান্না ও বিতরণ চলছে কীভাবে?

এই প্রশ্ন করা হয়নি, সচিব বা প্রতিমন্ত্রীও এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে, প্রতিমন্ত্রী একটি কথা বলেছেন, তিনি নিজেও খিচুড়ি ব্যবস্থাপনা দেখা ও শেখার জন্যে ভারত সফর করেছেন। এখানে প্রাসঙ্গিক তথ্য, শুধু প্রতিমন্ত্রী একা নন, সরকারের আরও অনেক কর্মকর্তা, এনজিও, আইএনজিওর কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করেছেন। তারা খিচুড়ি রান্না ও বিতরণ কার্যক্রম দেখেছেন, শিখেছেন। যার ওপর ভিত্তি করে ২০১৯ সালে ‘মিড-ডে মিল’ নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। যে নীতিমালা অনুসরণ করে পর্যায়ক্রমে দেশের সব স্কুলে দুপুরে খিচুড়ি দেওয়া হবে।

১৬টি উপজেলার স্কুলগুলোর বিতরণ ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলছে? অন্যান্য স্কুলে চালু হলে বিতরণ ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলবে?

কার্যক্রম চলমান স্কুলগুলোতে আলাদা করে রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা বিবেচনায় কোনো স্কুলে একজন বাবুর্চি ও দুই জন সহকারী এবং কোনো স্কুলে একজন বাবুর্চি ও একজন সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের বেতন পাঁচ হাজার, চার হাজার এবং দুই হাজার টাকা। বাবুর্চি প্রতিদিন বাজার করেন। বেতন এবং বাজারের টাকা দেয় সরকার, স্থানীয় এনজিওর মাধ্যমে। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ, বাবুর্চি-সহকারীদের বেতনও বন্ধ জুলাই থেকে।

চালের মান কেমন হবে, চাল কীভাবে ধুতে হবে, কত কেজি চালের সঙ্গে কত কেজি সবজি মেশানো হবে, কোন কোন সবজি মেশানো হবে, স্থানীয় কৃষকদের থেকে সবজি কেনার চেষ্টা করতে হবে, প্রয়োজনীয় সবজি যাতে এলাকার কৃষকরা উৎপাদন করেন সে বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে খাবার থালা নিয়ে আসে। রান্না করা খিচুড়ি তাদের থালায় তুলে দেওয়া হয়। স্কুলেই তারা সেই খিচুড়ি খায়। পুষ্টিবিদের সমন্বয়ে খিচুড়ির পুষ্টিমান নিশ্চিত করা হয়েছে। বাবুর্চি ও সহকারীদের রান্না ও বিতরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দেশের পুষ্টিবিদ ও বিদেশ থেকে দেখে-শিখে আসাদের সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ির কালুখালী উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খিচুড়ি রান্না ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা দেখার সুযোগ হয়েছিল করোনার বন্ধের আগে। কথা বলেছিলাম বাবুর্চির সঙ্গে। হামিদুলের মা নামে যিনি পরিচিত। প্রশিক্ষণের পর তিনি পুষ্টিমান সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ নারীদের মধ্যে।

নতুন স্কুলে কর্মসূচি চালুর সময় প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে, চালু স্কুলের দক্ষ কর্মীরাই প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। ১৬টি উপজেলার স্কুলগুলোতে রান্না ও বিতরণ ব্যবস্থা যেমন, চালু হতে যাওয়া অন্যান্য সব স্কুলের রান্না ও বিতরণ ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ একই রকম হবে। ২০১৯ সালের ‘মিড-ডে মিল’ নীতিমালা সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এগুলো কোনো গোপন তথ্য না। এসব তথ্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে পাওয়া।

তাহলে নতুন করে বিতরণ ব্যবস্থা শেখার প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যেতে হবে কেন? চলমান ১৬টি উপজেলার কোনো স্কুলে গিয়ে বাবুর্চি বা সহকারীর কাছ থেকে সরকারের ৫০০ কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। রান্না কীভাবে হচ্ছে, তা শিখতে পারবেন। একটি স্কুলে সারাদিন থাকলে, বাজার করা, সবজি কাটা-বাছা, চাল ধোয়া, রান্না, শিক্ষার্থীরা কীভাবে বাড়ি থেকে থালা নিয়ে স্কুলে আসে, বাবুর্চি ও সহকারী কীভাবে খিচুড়ি বিতরণ করেন, শিক্ষকরা কীভাবে সহায়তা করেন, শিক্ষার্থীরা কীভাবে খিচুড়ি খায়, কোথায় বসে খায়, থালা-হাত ধোয় কীভাবে, পানির উৎস কী, চাপকল না সাপ্লাইয়ের পানি, চাপকল কে চেপে দেয়, একটি স্কুল থেকে একদিনে হাতে-কলমে পুরো প্রক্রিয়ার প্রশিক্ষণ পাওয়া সম্ভব। শেখা-জানা বা প্রশিক্ষণই যদি উদ্দেশ্য হয়, তবে বিদেশ যাওয়ার তো কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাহলে তারা বিদেশ যেতে চাইছেন কেন?

গ্রহণযোগ্য যে জ্ঞান বাংলাদেশে নেই, সে বিষয়ে জানা বা প্রশিক্ষণের জন্যে অবশ্যই বিদেশে যাওয়া যেতে পারে বা যাওয়া উচিত। কিন্তু, বাংলাদেশের বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গেছে এমন, প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে যাওয়া হলেও, তা মূলত ভ্রমণ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। খিচুড়ি রান্না বা বিতরণ শিখতে বিদেশ যাওয়া সেই ভ্রমণ বিলাসিতারই অংশ। এমন ঘটনা যত সংখ্যক ঘটছে, তার অতি সামান্য অংশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, জনগণ জানছেন। জানছেন না এমন আরও বহু ভ্রমণ বিলাসিতার ঘটনা অন্তরালে থেকে যাচ্ছে। সরকারি বা উন্নয়ন সংস্থার যেকোনো প্রকল্প মানেই এক বা একাধিক বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কাজ করে সরকারকে সম্পৃক্ত করে। এটা প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের এক বা একাধিকবার বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না থাকলে প্রকল্পের ফাইল নড়াচড়া করে না। যে কারণে পুকুর কাটা বা সংস্কার শিখতে নেদারল্যান্ড যাওয়া, বিল্ডিং দেখতে বিদেশে যাওয়া, দুটি ক্যামেরা কিনতে জার্মানি যাওয়া, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দেখতে উগান্ডায় যাওয়ার মতো পরিকল্পনা নিতে দেখা যায়। এগুলো প্রায় সবই কিন্তু বিদেশ থেকে আনা ঋণের টাকা।

সরকারি কর্মকর্তাদের এই ভ্রমণ বিলাসিতা ও কেনাকাটা একই সূত্রে গাঁথা। তারা যেমন বিল্ডিং দেখতে বিদেশ যেতে চান, তেমন দুই শ টাকার একটি বটি ১০ হাজার টাকা দিয়ে, ১৫০ টাকার একটি তালা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা, ১২০০ টাকার পর্দা ১৮ হাজার টাকায় কেনেন, কেনার প্রস্তাব দিতে পারেন। কেনাকাটার ক্ষেত্রেও যা ঘটে, বালিশ-বটি-পর্দা-ড্রামের মতো অতি সামান্য কিছু প্রকাশিত হয়।

‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’ সরকারি কর্মকর্তারা তাদের কর্মের অংশ করে নিয়েছেন। জুম মিটিংয়ের তারা কয়েক লাখ টাকার চা-নাশতা-স্টেশনারি কেনা বাবদ খরচ করতে পারেন।

দেশের মানুষ এসব সংবাদ দেখছেন, জানছেন, পড়ছেন। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, তর্ক করছেন আর ট্রল করছেন। এ ছাড়া, তাদের আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। এক্ষেত্রে সব দায় অবশ্য সংবাদকর্মীদের। তারা সংবাদটি প্রকাশ করছেন। প্রতিমন্ত্রী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপি-জামায়াত থেকে যারা সাংবাদিকতায় এসেছেন, এসব সংবাদ তারা প্রকাশ করছেন। এসব সংবাদ প্রকাশ করায় যে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তা তারা বিবেচনায় রাখছেন না, সেই জ্ঞানও তাদের নেই।

বিল্ডিং দেখতে যেতে চাইলে বা গেলে, খিচুড়ি রান্না বা বিতরণ শিখতে গেলে বা যেতে চাইলে, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে সুবিধা নিলে বা জুম মিটিংয়ে চা-সিঙ্গারা খেলে সমস্যা নেই। এতে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয় না।

যে সংবাদ প্রকাশ করলে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, সেই সংবাদ জন্ম দিলে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়?

রোগের নাম ‘ভ্রমণ বিলাসিতা’, রোগের নাম ‘বিএনপি-জামায়াত’ টেনে আনা, রোগের নাম ‘তালা-বটি-বালিশ-পর্দা’ কেনাকাটা। প্রতিকার কিসে, রোগের চিকিৎসায় না দায় চাপানোয়?

s.mortoza@gmail.com

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top