পুলিশের এসব ছবি কি আমরা দেখতে চাই? | The Daily Star Bangla
০৩:৪২ অপরাহ্ন, নভেম্বর ১০, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৩:৫২ অপরাহ্ন, নভেম্বর ১০, ২০২০

পুলিশের এসব ছবি কি আমরা দেখতে চাই?

ছবি ১.

বাবার টি-শার্টে হাত রেখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে ছোট্ট শিশু। পাশে নীল শাড়ি পরা শিশুটির মা। হাসিখুশি ভরা পরিবারের এই রঙিন ছবিটি এখন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে। এই পরিবারের প্রধান ব্যক্তির নাম আনিসুল করিম। পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড নামে একটি মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের কর্মচারীদের পিটুনিতে নিহত হয়েছেন।

ছবি ২.

রশি দিয়ে হাত-পা বাঁধা এক যুবক। বসে আছেন। তাকে ঘিরে উৎসুক/উত্তেজিত জনতা। মারধরের হাত থেকে বাঁচতে হাতজোড় করছেন। তার নাম আকবর হোসেন। সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও বরখাস্তকৃত এসআই। ফাঁড়িতে এক যুবককে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি। ঘটনার পর থেকে প্রায় এক মাস পালিয়ে থাকার পর জনগণ তাকে আটক করে পুলিশে দেয়।

প্রশ্ন হলো, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, লাগামহীন দুর্নীতি, নিরীহ মানুষকে হয়রানি, মিথ্যা মামলায় নাগরিকদের ফাঁসিয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক দলের ক্যাডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াসহ নানা কারণে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থাকলেও জনগণের করের পয়সায় পরিচালিত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এমন ছবি আমরা দেখতে চাই কি না? হাসপাতালে একজন পুলিশ অফিসারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কিংবা একজন অফিসারকে হাত-পা বেঁধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের চিহ্ন হতে পারে না— তাতে ওই পুলিশ অফিসার যতই অপরাধী হোন না কেন।

এখানে আরও কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি:

১. এসআই আকবরকে আসলেই কারা আটক করেছে এবং যদি স্থানীয় মানুষ তাকে আটক করে থাকে, তাহলে এখন এই ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কেন ক্রেডিট নিতে মরিয়া?

২. মানুষ কি নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে?

৩. পুলিশের ভাবমূর্তি কি এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে, কোথাও কোনো পুলিশ অফিসার বা সদস্য লাঞ্ছিত হলে জনগণের একটি বিরাট অংশ খুশি হয়?

৪. বহু বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে যে, পুলিশে সংস্কার চলছে। সেই সংস্কার কি আদৌ হয়েছে বা হলে তার প্রতিফলন কোথায়?

৫. মানসিক হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসার নামে আসলে কী হয়?

ইস্যু আকবর:

গণমাধ্যমের খবর বলছে, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও বরখাস্তকৃত এসআই আকবর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়েন। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় যে আকবর কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করবেন। তাই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়। তারাই আকবরকে আটক করেন।

তবে, আকবরকে গ্রেপ্তারের আগে তাকে রশি দিয়ে বাঁধার যে দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ বলছে, আটকের আগে কেউ এরকম ভিডিও বানিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে, পুলিশ কোনো ভিডিও বানায়নি। কিন্তু, আকবরের আটকের পর যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে আকবর ও তাকে আটক করা ব্যক্তিদের কথাবার্তায় পরিষ্কার যে, তারা ভারতীয় অংশের খাসিয়া জনগোষ্ঠী। 

ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আকবরকে ভারতে খাসিয়ারা আটক করে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।’ ১৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়কও জানিয়েছেন, আকবরকে ভারত সীমান্তের অভ্যন্তরে খাসিয়ারা আটক করে। পরে তারা সীমান্ত এলাকার আব্দুর রহিম নামে এক বাসিন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করে সীমান্তেই আকবরকে তার হাতে তুলে দেন। গণমাধ্যমের খবর বলছে, আটকের পর খাসিয়াদের জেরার মুখে আকবর জানান, সিনিয়র এক অফিসারের কথায় তিনি পালিয়ে যান। তার মানে আকবরকে কোথা থেকে আটক করা হয়েছে এবং কারা আটক করেছেন, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও পুলিশ দাবি করছে যে, তারাই আটক করেছে।

আকবরকে যারাই আটক করুক কিংবা যেখান থেকেই আটক করা হোক না কেন, তার যে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেটি যে রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে— তাতে সন্দেহ নেই। ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠানের নয়— এটি যেমন সত্য, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানে অপরাধীর সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, তখন সেই অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারে না। ফলে একজন পুলিশ অফিসারকে ধরে হাত-পা বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ বা মারধরের ছবি যখন সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে পড়ে, তখন জনমনে এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানে কারা নিয়োগ পান? থানা হেজাজতে নিয়ে একজন নাগরিককে পিটিয়ে হত্যার লাইসেন্স তাদের কে দিয়েছে? এমন কাজ তারা কেন করেন যার ফলে তাকে পালিয়ে যেতে হয় এবং জনগণ তাকে ধরে রশি দিয়ে বেঁধে তারই সহকর্মীদের হাতে তুলে দেয়? এতে যে কেবল একজন আকবরের সম্মান নষ্ট হলো তা তো নয়, বরং পুলিশ বাহিনীর সম্পর্কেই মানুষের ধারণা আরও খারাপ হয়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন সদস্যের এই পরিণতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ইস্যু আনিসুল করিম:

গণমাধ্যমের খবর বলছে, আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তার ব্যাচের অনেকেই পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হলেও অজানা কারণে তিনি পদোন্নতি পাননি। এ নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এজন্য ৯ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার পরিবারের সদস্যরা তাকে রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড নামে একটি মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু, হাসপাতাল থেকে পুলিশ যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ উদ্ধার করেছে, সেখানে দেখা গেছে, আনিসুল করিমকে সাত জন ব্যক্তি ধরে টেনে-হিঁচড়ে একটি কক্ষে ঢুকাচ্ছে। এরপর তাকে ফেলে তিন জন তার পিঠের ওপরে, দুই জন পায়ের ওপরে এবং দুই জন হাত ধরে বেঁধে ফেলে। দুই জন কনুই দিয়ে তার পিঠ ও ঘাড়ে আঘাত করছে। মারধরের কয়েক সেকেন্ড পর অচেতন হয়ে পড়েন আনিসুল। তারপর তার মুখে পানি ছেটানো হয়, সে সময় মেঝেতে পানি দিয়ে কিছু একটা মুছতেও দেখা যায়। এর কিছুক্ষণ পর অ্যাপ্রন পরা দুই জন নারীকে তার বুকে পাম্প করতে দেখা যায়। পরে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।

প্রশ্ন হলো— পদোন্নতি না হওয়ায় একজন পুলিশ অফিসার যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং তাকে যে মানসিক হাসপাতাল পর্যন্ত নিতে হলো, তার দায় কার? পুলিশের বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে যে বিতর্ক বহুকাল ধরেই রয়েছে, সেখানে কি কোনো উন্নতি হয়নি?

আনিসুল করিমকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তিনি একজন রোগী। একজন রোগীকে এভাবে নির্যাতনের কারণ কী? এই হাসপাতালের চিকিৎসা পদ্ধতিই বা কী? অন্যান্য বেসরকারি মানসিক হাসপাতালে কী চিকিৎসা হয়? বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে তোলা মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে অনেক ধরনের অপরাধ সংশ্লিষ্টতার খবর এসেছে। মাদক নিরাময়ের নামে মাদক চোরাকারবারের অভিযোগও রয়েছে। আবার এসব কেন্দ্রে গিয়ে কতজন আসলেই সুস্থ হন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এসব বেসরকারি হাসপাতাল কীভাবে লাইসেন্স পাচ্ছে, কী চিকিৎসা দিচ্ছে, চিকিৎসার নামে মানুষের কাছ থেকে কী পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, চিকিৎসার আড়ালে কী করছে— তা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো খবর রাখে? কালেভদ্রে দুয়েকটা হাসপাতালে অভিযানের খবর আসে। জেল-জরিমানাও হয়। কিন্তু, তাতে শতকরা কতজন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়? এসব দেখা ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব যাদের, তাদের একটি অংশই যে এসব হাসপাতালকে চিকিৎসার নামে গলাকাটা ব্যবসার সুযোগ করে দেয়, তাতে সন্দেহ নেই। না হলে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব চলতে পারে না।

আনিসুল করিমের এই ঘটনায় আরও যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হলো, তাকে ভর্তির সময় নিশ্চয়ই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পরিচয় জেনেছে। একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারকে হাসপাতালের কর্মচারীরা কীভাবে পিটিয়ে মারার সাহস পায়? সেখানে যে সিসি ক্যামেরা আছে, সেটিও তাদের জানা। সুতরাং এই ছবি যে পুলিশের হাতে চলে যাতে পারে, সেটি কি তাদের ভাবনায় ছিল না? তা ছাড়া, কী এমন পরিস্থিতি সেখানে তৈরি হয়েছিল যে, সাত জন লোক মিলে একজন যুবককে এভাবে মারধর শুরু করল? আনিসুল করিম শুধু একজন পুলিশ অফিসার বলেই কথা নয়, তার জায়গায় অন্য কোনো পেশার বা বয়সের মানুষের সঙ্গেও যদি হাসপাতালের কর্মচারীরা এমন আচরণ করে থাকেন, সেটিও ভয়াবহ। প্রশ্ন হলো, বেসরকারি পর্যায়ে কী ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এবং সেখানে আদৌ কোনো মনিটরিং আছে কি না?

আমীন আল রশীদ: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।) 

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top