পশ্চিমবঙ্গের মডেল আমাদের কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে | The Daily Star Bangla
০৯:২১ অপরাহ্ন, মে ২৩, ২০১৯ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, মে ২৩, ২০১৯

পশ্চিমবঙ্গের মডেল আমাদের কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে

তুলনামূলক আলোচনায় আমরা খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। “এমনকি অমুক দেশের চেয়েও আমরা এগিয়ে গিয়েছি”-প্রায়ই শুনতে হয় এমন বক্তৃতা। আজকের তুলনামূলক আলোচনার বিষয় কৃষক।

বাংলাদেশের কৃষকের অবস্থা দাঁড়িয়েছে বাবা মা ছাড়া এতিম সন্তানের মতো, যেন দেখার কেউ নেই। যাদের সুখ বা দুঃখ বলে কিছু নেই। যাদের নিয়ে কথা বলারও কেউ নেই।

ধান নিয়ে বিপাকে কৃষক। ধান চাষ করে, বাম্পার ফলন ফলিয়ে কাঁদছেন কৃষক। খেত ভর্তি সোনা কিন্তু সোনা ঘরে তোলার মতো সঙ্গতি কৃষকের নেই। ঘরে যদিওবা তোলা যায়, বাজারে দাম নেই। সোনা ফলিয়ে যেন মহা অন্যায় করেছেন কৃষক, তারই এখন প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে।

কৃষক যখন দিশেহারা, সরকারও যেন বেপরোয়া। কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, “ধানের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলেও এই মুহূর্তে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে দাম বাড়ানোর তেমন সুযোগ নেই।” সব মিলিয়ে এক ভজকট অবস্থা। ভরা দুপুরে যেন কৃষকের চোখে মুখে অন্ধকার।

দায় কার কৃষকের না সরকারের? সবাই বলছেন সরকারের। আর সরকার বলছে তাদের কিছু করার নেই। আসলেই কি তাই? আমরা কথায় কথায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করি। তবে চলুন একটু দেখে আসি বাংলা ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গের চিত্র।

ভারত ধান উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ভারত সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে চলছে যুগ যুগ ধরে। আমরা আজকে শুধু একটা উদ্যোগের দিকে তাকালেই বুঝতে পারব আমাদের সরকারের ভূমিকা কী হতে পারত।

এখানে একটি কথা বলে রাখা জরুরি যে, সামগ্রিকভাবে ভারতের কৃষক নানা রকম জটিল সঙ্কটে আছে। লক্ষ লক্ষ কৃষক বারবার প্রতিবাদ জানাতে কয়েক’শ মাইল পায়ে হেঁটে দিল্লিতে আসে। ভারতে সরকারি হিসাবই বলছে ২০১৪-২০১৬ সময়কালে ৩৬,৩২০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তার মানে দৈনিক ৩৩ জন। এই দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভালো। কারণ শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের কৃষক আশায় বীজ বুনতে জানে, চ্যালেঞ্জ নিতে জানে, লড়তে জানে।

সংবাদ মাধ্যম থেকে যতটুকু জানা যায় তাতে ভারতীয় কৃষকদের আত্মহত্যার কারণ অবশ্য ভিন্ন। অনেকটা প্রাকৃতিক কারণ। যেমন খরা, খারাপ আবহাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফসল না পাওয়া আর তার ফলে ঋণে জর্জরিত হওয়া। কিন্তু কৃষক ফসল উৎপাদন করেছে কিন্তু দাম পাচ্ছে না এরকম ঘটনা খুবই কম।

আমাদের সরকার একটু সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়ালে, চিত্রটা হয়ত আর্তনাদের পরিবর্তে অট্টহাসির হতে পারত। সেই প্রেক্ষিতেই তুলনার প্রসঙ্গ।

ভারতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে “কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল ক্রপস অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি)” নামে একটি সংস্থা আছে যেটা কৃষিতে মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।

কৃষিতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বলতে বোঝায় সরকার এই দামে কৃষকের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনবে। সরকার বর্তমানে কৃষকের কাছ থেকে ২৩ ধরনের পণ্য কিনে কৃষক যেন তার ন্যায্য মূল্য পায়। ফসল বোনার সময়ই পণ্যের দাম ঠিক করা হয় এবং তা বাজার মূল্য থেকে কিছুটা বেশি থাকে।

১৯৬০ সালের খাদ্য সংকটের পর কৃষকে চাষে উৎসাহী করতে ভারত সরকার কৃষিতে মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) বা ন্যূনতম সহায়ক মূল্যর প্রচলন করে। এই কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল ক্রপস অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি) কমিটিতে দুজন কৃষক প্রতিনিধি থাকেন যার কারণে মূল্য নির্ধারণে কৃষকের সরাসরি একটা ভূমিকা থাকে।

চলতি বোরো মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গে মোট ধান উৎপাদিত হয়েছে আড়াই কোটি টন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৫২ লক্ষ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৮৫০০ কোটি রুপি বরাদ্দ রেখেছে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার জন্য। বাজারে প্রতি কুইন্টাল ধানের দাম ১৪৫০-১৫০০ রুপি আর সরকার কিনছে ১৭৫০ রুপিতে। সরকার আরও বলছে যেহেতু বাজারে ধানের দাম কম তাই সরকার হয়তো আরও বেশি ধান কিনতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার কৃষকদের সহায়তা করার জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের সঙ্গে প্রতি কুইন্টাল ধানে ২০ টাকা বোনাস দিচ্ছে। এছাড়াও কৃষক পিছু বিক্রয়যোগ্য পরিমাণ ৯০ কুইন্টাল করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যাতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কৃষক ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের সুবিধে নিতে পারেন, যা বাজারদরের চেয়ে কুইন্টাল পিছু ২৫০-৩০০ টাকা বেশি।

এবার বাংলাদেশের দিকে আসি। গত আমন মৌসুমে ৮ লাখ টন চাল কিনেছে সরকার। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য তখন বাজার মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ৩ টাকা বেশি দরে চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়। চাল ক্রয় করা হয়েছে মিলারদের কাছ থেকে। অর্থাৎ সরকারের প্রণোদনার অর্থ গেছে মিলারদের পকেটে, প্রান্তিক কৃষকরা কিছুই পায়নি।

চলতি বোরো মৌসুমে, প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে সরকার ধান কিনছে। ২৫ এপ্রিল থেকে ধান কেনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত কেনা হয়েছে মাত্র ৫০ টনের মতো। সরকার দেড় লাখ টন ধান আর ১০ লাখ টন চাল কিনবে। ধান কিনবে কৃষকের কাছ থেকে আর চাল কিনবে মিলারদের কাছ থেকে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধান কিনছে মোট উৎপাদনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আর বাংলাদেশ সরকার কিনছে মোট উৎপাদনের ২০ ভাগের এক ভাগ।

যেহেতু একটা বড় অংশের ধান পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিনছে তাই ধানের বাজারে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ তাদের আছে। আর অন্য দিকে বাংলাদেশের সরকার ধান কিনছে খুব অল্প পরিমাণে তাও আবার সরাসরি ও প্রকৃত কৃষকদের অংশগ্রহণ এখানে খুবই কম।

মিল মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী আর চাল ব্যবসায়ীরা বাজার দখল করে আছে। এই ধান ক্রয় বাজারে কোন প্রভাব ফেলতে পারে না।

পশ্চিমবঙ্গ যদি পারে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে তবে আমরা কেন পারব না? আমাদের দেশে কি ভারতের আদলে মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস এবং কমিশন ফর এগ্রিকালচারাল ক্রপস অ্যান্ড প্রাইসেস (সিএসিপি) গঠন করে কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া যায় না?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ছবি বেশ আলোড়ন তুলেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক রিকশাওয়ালার ঘামে ভেজা শরীরে সাদা গেঞ্জিতে লেখা “করব না আর ধান চাষ, দেখব তোরা কি খাস?”

এই হুমকি কিন্তু পৃথিবীর যেকোনো মারণাস্ত্রের চেয়ে ভয়ংকর। আজ কৃষক কাঁদছে কিন্তু আমরা যদি নির্বিকার থাকি তবে কালকে দেশের অন্যদেরও কাঁদতে হবে।

কৃষক যদি ধান উত্পাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন আগামীতে শুধু নিজের জন্য ধান উৎপাদন করে বাকি জায়গায় অন্য ফসল চাষ করেন তবে আমরা ভেতো বাঙ্গালীই মরব ভাতের অভাবে। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top