গণপাস, মেধাজীবিতা ও আনিসুজ্জামান স্যারের দুঃখ | The Daily Star Bangla
০৪:১০ অপরাহ্ন, অক্টোবর ১৩, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৪:১৭ অপরাহ্ন, অক্টোবর ১৩, ২০২০

গণপাস, মেধাজীবিতা ও আনিসুজ্জামান স্যারের দুঃখ

গণপাসের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে দেশে। এইচএসসি ও সমমানের চলতি বছরের শিক্ষার্থীরা সবাই পাস করবে এ বছর। চমকপ্রদ ও বিস্ময় জাগানিয়া খবরের এখানেই শেষ নয়। পাস করতে যাচ্ছে আরও সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী, যারা গত বছর অকৃতকার্য হয়েছিল। গণপাসের এই নজির করোনা মহামারিকালে পৃথিবীর কোথাও না ঘটলেও বাংলাদেশে ঘটতে যাচ্ছে ঠিকই। বড় ধরনের ব্যত্যয় না ঘটলে গণপাসের ঘটনা যে ঘটবে এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আবারও চূড়ান্তভাবে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া হবে, সে কথা বলা বাহুল্য।

গণপাসের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। তার মাশুল যে কীভাবে ও কত প্রকারে কড়ায়-গন্ডায় উসুল করে দিতে হয়, এদেশ তা মর্মে মর্মে বুঝেছে। এখানে যেহেতু ভুল স্বীকার করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি, তাই সেই প্রত্যাশাতো তো দূর অস্ত, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার উদাহরণও নেই। উপরন্তু আছে ভুলকে নানা মোড়কে, নানা যুক্তিতে যৌক্তিক হিসেবে তুলে ধরার নোংরা প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ হাসিলের উল্লম্ফন। গণপাস একটা জাতির শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কতটা ক্ষতিকর ও সর্বনাশা, তা উল্লেখ করে গেছেন সদ্যপ্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। ‘বিপুলা পৃথিবী’ সেই রূঢ় সত্যের অমোঘ সাক্ষী হিসেবে হাজির আছে আমাদের মাঝে।

তাহলে আবার কেন গণপাস? কেন ১৯৭২ সালের গণপাস পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার করুণ ও মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নেব না? মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯৭২ সালের গণপাসের চেয়েও এবারের গণপাসের ব্যাপ্তি আরও বেশি। সুতরাং তার সর্বনাশ এবং ক্ষতিও অত্যাধিক। ১৯৭২ সালের সেদিনের সেই ভুল ও হঠকারিতা সিদ্ধান্তের মাশুল আমাদেরকে আজও দিতে হচ্ছে। সেই সিদ্ধান্ত থেকে সৃষ্ট ক্ষত ক্যানসারে রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

তারপরও আমাদের ভাবান্তর নেই। শোচনীয় অবস্থা দেখে অনুশোচনাও নেই। সেদিনের সেই ক্ষত আজও শুকায়নি, শুকানোর চেষ্টা হয়নি প্রবলভাবে, কায়মনোবাক্যে তো নয়ই। উল্টো যোগ হতে যাচ্ছে আরও এক গণপাসের অধ্যায়। যার পরিণাম ও পরিণতি থেকে শিক্ষাব্যবস্থার মুক্তি কয় প্রজন্মে মিলবে, আদৌ মিলবে কি না, তার উত্তর খোঁজা হবে অন্ধের হস্তি দর্শনের শামিল। কেননা, দুই প্রজন্ম প্রায় পেরোতে চললেও প্রথমটা বিষবৃক্ষ হয়ে কেবলই শেকড়-বাকড় গজিয়েই চলছে।

দুঃখজনক ও লজ্জাকর বাস্তবতা হলো— এটা নিয়ে আমাদের মেধাজীবীদেরও ভাবান্তর আছে বলে মনে হয় না। ঘোষণা আসার পর থেকে তেমনটা দৃশ্যমানও হয়নি। সবকিছুকেই বিতর্কের বিষয় হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি হাজিরের কসরতই করে চলেছেন তারা। কিন্তু, বিষয়টা বিতর্কের নয় যেমন, তেমনি অনুমাণ-নির্ভর কথা বলারও নয়। কোনো মহামারিই বছরের পর বছর জগদ্দল পাথর হয়ে পৃথিবীর ওপর বসে থাকেনি। জীবন ও প্রকৃতির ধর্ম সেটা নয়। কোনোভাবেই সেটা হতে পারে না।

সুতরাং এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়, যার আপাত সমাধান দিয়ে আমরা দূরবর্তী সমস্যাকে জিইয়ে রাখছি, প্রকট করেও তুলছি। অন্যেরা এই বিষয়টা বুঝতে কার্পণ্য, কৌশল অবলম্বন কিংবা অসাধুতার আশ্রয় নিলেও মেধাজীবীরা সেটা নিতে পারেন না। কারণ মেধাজীবীদের দায় এখানেই সবিশেষভাবে বর্তায়। শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দূরবর্তী লাভালাভ, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন, সম্ভাবনা-সর্বনাশটা দেখতে পান বলেই তারা মেধাজীবী। ব্যক্তি-সমাজ-প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্রে তারা বিশেষভাবে সম্মানীয় এ কারণে যে, তারা সত্যটা বলেন, এমনকি ঝুঁকি আছে জেনেও অপ্রিয় সত্যটাকেই জারি রেখে যান।

চকলেট খেতে ভালো লাগে বলে ছোটরা সেটা পছন্দ করে এবং কেবলই খেতে চায়। সেই চাওয়াটাকে রোধ করে, সামাল দেয় কে? বাবা-মা। অর্থাৎ বড়রা। ছোটরা ভাবে, বড়রা কত খারাপ! আমার চকলেট খেতে ভালো লাগে, অথচ আমাকে ইচ্ছামতো চকলেট খেতে দেয় না। কিন্তু, বড়রা জানে, চাকলেট ভালো লাগে, পছন্দের বলেই সেটা ইচ্ছামতো খেতে নেই। কারণ তাতে ক্ষতি হয়, সর্বনাশ ঘটে। দাঁত নষ্ট হয়ে যায়, ওবেসিটি হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

সমাজে-রাষ্ট্রে এই ‘বড়’র ভূমিকা পালন করে মেধাজীবীরা। সমাজ-রাষ্ট্রকে দাঁত নষ্ট হওয়া, ওবেসিটি থেকে রক্ষা করার দায় তাদেরও। শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দূরবর্তী ভালোমন্দও টের পান, উপলব্ধি করেন। সে কারণে, কেউ যদি বলে অমুক তো ইচ্ছামতো চকলেট খায়, তার তো এসবের কোনো ক্ষতি হয়নি। তখন তারা বলেন, অমুকের হয়নি বলে যে তোমার হবে না, তেমনটা কোনো যুক্তির মধ্যে পড়ে না। সুতরাং, তুমি চকলেট খেতে পার, তবে ইচ্ছামতো নয়। এখানেই মেধাজীবীর অনন্যতা, সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য তাদের অপরিহার্যতা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের বিশিষ্টতা। এইচএসসি ও সমমানের শিক্ষার্থীদের গণহারে পাস করানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ পরবর্তী সময়ে আমরা মেধাজীবীদের সেই ভূমিকায় দেখতে পাইনি। এখনো প্রত্যাশিত দায়িত্ব ও কর্তব্যে তো নয়ই।

আনিসুজ্জামান স্যারের দুঃখ প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৯৭২ সালে গণহারে পাস করানোর ঘটনায় তিনি ভীষণভাবে দুঃখ পেয়েছিলেন, ব্যথিত হয়েছিলেন। ‘বিপুলা পৃথিবী’র ২৪ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগেই বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে ইউসুফ আলী যে-নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিলেন, সে-কথাটা এখানে বলে নিই। পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে শিক্ষাবিষয়ে আমি যে কয়েকটি কাগজ তৈরি করেছিলাম, তার একটিতে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ যে যে-ক্লাসে পড়ত, ১৯৭২ সালের ১ মার্চে তাকে আবার সেখান থেকে পড়াশোনা শুরু করতে হবে; এই একটি বছর জাতীয় ক্ষতি হিসেবে পরিগণিত হবে; এবং সরকারী চাকরিতে প্রবেশের বয়ঃসীমা এক বছর বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু মন্ত্রীসভায় এ প্রস্তাব বিবেচিত হওয়ার আগেই জাতীয় পরিষদ-সদস্য ইউসুফ আলী এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গণউন্নতি দেওয়া হলো, অর্থাৎ ১৯৭১ সালে যে যেখানে পড়ত, ১৯৭২ সালে তার পরবর্তী শ্রেণিতে সে উন্নীত হবে। এই ঘোষণার বিষয়ে তিনি যে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেননি, সে-কথা আমি তাজউদ্দীনের কাছ থেকে জেনেছিলাম। বলা বাহুল্য, ঘোষণাটি ছাত্রদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং তা প্রত্যাহার করার মতো সাহস সরকারের হয়নি। এতে যে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে কী সর্বনাশ হলো, অনেকে তা ভেবে দেখেননি।’

যেটা হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই, বলেও কোনো লাভালাভ নেই। আমরা শুধু সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারি। সতর্ক হতে পারি যেন সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কিন্তু, করোনা মহামারিকালে নেওয়া গণপাসের সিদ্ধান্তে প্রতীয়মান হলো আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে বড্ড অপারগ। ১৯৭২ সালের সিদ্ধান্ত যে কতটা হঠকারী ও সর্বনাশা ছিল, তা স্পষ্ট করেছেন আনিসুজ্জামান স্যার নিজেই। এজন্য কষ্ট করে পাঠ করতে হবে ‘বিপুলা পৃথিবী’র ৬৮ নম্বর পৃষ্ঠার কিয়দংশ।

তিনি লিখেছেন, ‘সেই যে বিনা পরীক্ষায় পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করে দেওয়া হলো ছাত্রছাত্রীদের, তার ফল আমরা অচিরেই ভোগ করতে শুরু করলাম। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেই ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে দাবি উঠলো সিলেবাস কমানোর। উঠবে নাই বা কেন? আগের ক্লাসের পড়া যে শেখেনি, পরীক্ষাগারে নির্ধারিত পরীক্ষা করেনি, পরের ক্লাসের পড়া কিংবা বিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষা তার কাছে তো দুরূহ মনে হবেই। এর প্রতিকার না-পড়া বিষয় জেনে নেওয়া নয়—সেই সময় ও সুযোগ কারো নেই—প্রতিকার আরো না-শেখা। অতএব, সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করার আন্দোলন শুরু হলো। প্রথম-প্রথম কেউ গা করেননি এতে, কিন্তু দেখা গেল ছাত্রেরা না-শেখার পণ করেছে। মাস ছয়েক পরে ছাত্র-হিতৈষী শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্থির করলো, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যসূচি অর্ধেক করে দেওয়া হবে। জয়ধ্বনি করতে করতে আন্দোলনকারী ছাত্রেরা ক্লাসে ফিরে গেল। ওদিকে গণপরীক্ষার ফলও সেবার হলো খুব সন্তোষজনক। অত উচ্চহারে পাস এর আগে আর দেখা যায়নি, কারণ পরীক্ষার্থীরা বেশ স্বাধীনভাবে পরীক্ষা দিয়েছে।’

১৯৭২ সালে গণপাসের সিদ্ধান্ত কাদের সঙ্গে, কোন যুক্তিতে, কীসব অভিজ্ঞতার আলোকে নেওয়া হয়েছিল, সেসব প্রশ্নের উত্তর অজানা। অবশ্য আনিসুজ্জামান স্যার ইঙ্গিত দিয়েছেন, এসব নিয়ে কারোর সঙ্গেই কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। এমনকি তাদের দেওয়া প্রস্তাবও আমলে নেওয়া হয়নি। প্রথম মহাযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধতো প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলেছে। তখন পৃথিবীর কোনো দেশকি এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে? সাতচল্লিশের দেশভাগও তো ভারতবর্ষের পাঞ্জাব ও বাংলায় সৃষ্টি করেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শরণার্থী-উদ্বাস্তু-ছিন্নমূল মানুষের মর্মন্তুদ এক অধ্যায়। তারপরও কি ঘটেছিল গণপাসের ঘটনা?

করোনা মহামারি এখনো চলমান। পৃথিবীর কোনো দেশেই এখনো গণপাসের ঘটনা ঘটেনি, সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা— কোথাও কি এরকম ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি? দক্ষিণ এশিয়ায় কিংবা পাশের দেশ ভারতেই? এ প্রসঙ্গে আলাপ হলো পশ্চিমবঙ্গের নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মননকুমার মন্ডলের সঙ্গে। তিনি জানালেন, সেখানে এরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিক বা প্রাথমিক— কোনো স্তরেই গণপাসের ঘটনা ঘটেনি। এরকম কোনো সিদ্ধান্ত জারিও করা হয়নি।

গণপাসের সিদ্ধান্তে কিছু কিছু বিষয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। শুধু গণমাধ্যম নয়, সামাজিক যোগযোগমাধ্যমেও হাজির হয়েছে নানাবিধ জিজ্ঞাস্য। এসব প্রশ্ন বা জিজ্ঞাস্যর উত্তর যদি মেলে, ইউটোপিয়ার মতো করে ধরে নিলাম মিলবে বা মিললেও, তা হলে কী হবে? এই গণপাস কি মর্যাদাকর হবে? শিক্ষা ব্যবস্থার সমূহ ও দূরবর্তী ক্ষতি ও সর্বনাশ রোধ করতে পারবে? পারবে না, কোনোভাবেই না। আর পারবে যে না, তার বড় উদাহরণ তো ১৯৭২, যার ভেতর-বাইরের নগ্ন নজির হাজির করেছেন আনিসুজ্জামান স্যার। পৃথিবীর কোনো দেশেই ১৯৭২ এর নজির নেই, আমাদের আছে। এবং সেই আমরাই হাঁটলাম ১৯৭২ এর পথে ২০২০ এও।

ফিরে যাই আবারও আনিসুজ্জামান স্যারের কাছে। ‘বিপুলা পৃথিবী’র ৬৯ নম্বর পৃষ্ঠায় তিনি লিখছেন, ‘আমরা যখন অন্যের ঘর সামলাতে ব্যস্ত, তখন যে আগুন লেগেছে নিজের ঘরেই, তা বুঝতে একটু দেরি হয়েছিল। টের পেলাম যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা দাবি করে বসলো, এমএ ফাইনালে তারা লিখিত পরীক্ষা দেবে না, মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে তাদের ফল নির্ণয় করতে হবে। আমাদের শিরে বজ্রাঘাত। শিক্ষকেরা এ-দাবি মানবেন না, পরীক্ষার্থীরাও ছাড়বে না। আবেদন-নিবেদন শেষ হলে শুরু হলো সংগ্রামের পালা। উপাচার্যের দপ্তরে ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা পর্যবসিত হয় ঘেরাওয়ে। আমরা না-খেয়েদেয়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাই, ছাত্রেরা পালা করে খেয়েদেয়ে এসে আমাদের ঘেরাও করে রাখে, কটুকাটব্য করে, স্লোগান দেয়। একসময় তারা পাহারা উঠিয়ে নেয়। আবার আলোচনা, আবার ঘেরাও। উত্তাপ বাড়তে থাকে। শেষে উপাচার্য ইন্নাছ আলী নিজেই সিদ্ধান্ত নেন : লিখিত পরীক্ষা হবে, তবে সে-পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে না; যারা লিখিত পরীক্ষা দেবে না, তারা কেবল মৌখিত পরীক্ষা দেবে। অর্থাৎ কেউ লিখিত ও মৌখিক দুটো পরীক্ষা দিয়ে, আর কেউ শুধু মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করবে।

ডিপ্লোমায় কোনো পার্থক্য থাকবে না, তবে নম্বরপত্রী দেখলে বোঝা যাবে। আমি এই ব্যবস্থা মেনে নিতে পারলাম না। অমন পরীক্ষার সঙ্গে কোনো সংস্রব রাখবো না বলে ছুটি নিয়ে সপরিবারে কলকাতায় চলে গেলাম।’

বুঝুন এবার, উপর্যুক্ত ঘটনার শিক্ষা কী বলে। আমরা যদি মনে করি, এইচএসসি ও সমমানদের গণপাস সেখানেই সীমাবদ্ধ, তাহলে সেটা হবে কুম্ভকর্ণের দিবাঘুমের মতো। আনিসুজ্জামান স্যারের জীবনাভিজ্ঞতা তো সেই সত্যকেই হাজির করেছে। সুতরাং, কোন যুক্তিতে নিজের সিদ্ধান্ত ও গৃহীত কর্মকাণ্ডকে জাস্টিফাইড করবেন?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। এখানে শিক্ষার্থী চিকিৎসক হওয়ার পর জানা যায়, ওই বছরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে যেখানে ঢেলে সাজানো জরুরি, সেখানে করোনা মহামারির দোহাইয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম গণপাসের। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!

১৯৭২ সালের গণপাস পরবর্তী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ শিক্ষার্থীদের অন্যায্য দাবি এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পেরে মনের দুঃখ-কষ্টে আানিসুজ্জামান স্যার না হয় চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। ২০২০ সালে আমাদের মেধাজীবীরা কোথায় গেলেন? আনিসুজ্জামান স্যারের দুঃখ দূর করার দায় কি আপনাদের ওপরও বর্তায় না?

ড. কাজল রশীদ শাহীন: সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

Kazal123rashid@gmail.com

(দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, দ্য ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার দ্য ডেইলি স্টার নেবে না।)

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top