গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রা এবং তথ্যযুদ্ধ | The Daily Star Bangla
০২:২৯ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৫:০৫ অপরাহ্ন, ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০

গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রা এবং তথ্যযুদ্ধ

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সারাবিশ্বে এবং দেশে গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রা আমাদের এই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে — আমরা কোথায় যাচ্ছি? কারো কারো কাছে এটা নিছক একটি নিরীহ প্রশ্ন। আবার তা কারো কারো কাছে এই পশ্চাদযাত্রা রোধের জন্যে কৌশল নির্ধারণের প্রথম পদক্ষেপ।

প্রায় ১৩ বছর আগে থেকে শুরু হওয়া গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রা এখনও শেষ স্তরে পৌঁছেনি। যদিও গত মাসে প্রকাশিত অর্থনৈতিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনটি একটি জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। পূর্ণ গণতন্ত্র আছে এমন দেশের সংখ্যা দুটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২টিতে, অন্যদিকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যাও বেড়েছে সমপরিমাণে – দাঁড়িয়েছে ৫৪-তে। সব মিলিয়ে সামগ্রিক চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার ছয় শতাংশেরও কম মানুষ পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বসবাস করেন; বিশ্বব্যাপী এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বসবাস করেন স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অধীনে। যদিও গত এক বছরে কোথাও নাটকীয়ভাবে গণতন্ত্রের অবনতি হয়নি এবং আমরা কোনো দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধসও দেখিনি। কিন্তু, এই দৃশ্যমান স্থিতিশীল অবস্থাটাই উদ্বেগের বিষয়।

বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৬ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতকে এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। ভারতে নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের অব্যাহত প্রচেষ্টা হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করা, জনসাধারণের ভেতরে বিভক্তি তৈরি, বিষাক্ত মেরুকরণের পথ তৈরি করা। এগুলো আগামীতে আরও ভয়াবহ অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

হাইব্রিড শাসন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি দেশের সামান্য উর্ধ্বমুখী পরিবর্তন বা এই ক্যাটাগরি থেকে দুটি দেশের উন্নতি থেকে মনে করার কারণ নেই যে, সবচেয়ে খারাপ অবস্থার অবসান হয়ে গেছে। বরঞ্চ এটা ভবিষ্যত পথরেখার জন্য এই প্রশ্নটিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে — এটাই কি নতুন স্বাভাবিক অবস্থা?

যে দেশগুলো গণতন্ত্রের ক্ষয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তাদের সেই অভিজ্ঞতার নির্দিষ্ট দিকগুলোর বিষয় বিবেচনায় রাখলেও গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রার কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অ-প্রাতিষ্ঠানিক উভয় দিকই আছে। প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলো সম্প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে জবাবদিহির ব্যাপারে সাংবিধানিক ধারার উদ্দেশ্যপূর্ণ পরিবর্তন যাতে করে সব ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের প্রধান ব্যক্তির - রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি কিংবা সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর - হাতে পুঞ্জীভূত হয়।

২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এরিকা ফ্রান্টতস এবং আন্ড্রিয়া কেন্ডাল-টেলর ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এই ধরণের স্বৈরতান্ত্রিক পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করেন। তাদের হিসেবে বিস্ময়করভাবে প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেছে। আইনসভার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। যেখানে আইনসভার কাজ ছিলো নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি ও ভারসাম্য তৈরি করা, সেখানে আইনসভা হয়ে উঠেছে নতুন কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার।

গণতন্ত্র ও এর বিপরীত যাত্রা বিষয়ক গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, এই উল্টো যাত্রায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রথম শিকার এবং গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রার প্রথম মাইল ফলক। নতুন কর্তৃত্ববাদীদের উত্থানের প্রধান পথ হচ্ছে নির্বাচন। ফ্রিডম হাউস, ইআইইউ, ভ্যারাইটিস অব ডেমোক্রেসির (ভিডেম) প্রতিবেদন এবং ল্যারি ডায়মন্ড, টমাস ক্যারিয়ার্স, স্টিভেন লেভিটস্কি, ড্যানিয়েল জিবল্টের মতো গণতন্ত্রবিষয়ক গবেষকরা এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যা সহজেই দেখা যায় তা হচ্ছে, বিরোধীদলকে নিষ্ক্রিয় করতেই আইনি ব্যবস্থার প্রয়োগ ও অতি-প্রয়োগ করতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করার ঘটনা।

গণতন্ত্রের পশ্চাদযাত্রার প্রতিক্রিয়া কেবল বর্তমান শাসনব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং এর প্রভাব শুধুমাত্র নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অস্থায়ী ক্ষতিই করে না। এটা একটি উদার রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রে পরিবর্তন আনে। এটা হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থাগুলো – যে ধরণের শাসনব্যবস্থা একই সঙ্গে একনায়কতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বহন করে – সে ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সত্য। হাইব্রিড রেজিমগুলোতে প্রায়শই রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যকার সীমানা অপসৃত হয়ে যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো দলের একটি অংশের মতোই কাজ করতে থাকে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ। নতুন কর্তৃত্ববাদীরা বিভিন্ন আইনি ব্যবস্থা ও কৌশল অবলম্বন করে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এবং গোটা মিডিয়া ব্যবস্থার ওপরে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে (বিস্তারিত দেখুন, How New Autocrats Curb Press Freedom দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৯)। তারা সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, সেগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।

এই পদক্ষেপগুলো সারাবিশ্বে দেশে-দেশে নতুন কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার ক্ষমতা বাড়াতে ও সংগঠিত করতে সাহায্য করে। তবে এখন বিশেষজ্ঞরা এই প্রশ্নটি তুলছেন যে নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ সত্ত্বেও কীভাবে নতুন কর্তৃত্ববাদীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছেন এবং তাকে বৈধতা দিচ্ছেন। এর উত্তরে একটি কারণ দেখানো যাবে না। অতীতের স্বৈরাচারীদের মতো নয় নতুনরা। তারা নতুন নতুন পদ্ধতি এবং কৌশল অবলম্বন করতে পুরনোদের থেকে বেশি পারদর্শী। কর্তৃত্ববাদীদের টিকে থাকাটা অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। তার মধ্যে আছে সমালোচকদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ এবং বল প্রয়োগের ভীতি সঞ্চার, তাদের অনুগত প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, বৈধতার এক বাতাবরণ তৈরি, সমাজের বিভিন্ন অংশকে কো-অপ্ট করা। এমন অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর তা হলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ।

তথ্য নিয়ন্ত্রণের একটি দিক হচ্ছে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ। এই প্রচেষ্টাকে অবশ্যই প্রত্যক্ষভাবে সেন্সরশিপ বা প্রোপাগান্ডা থেকে আলাদা হতে হয়। তথ্য নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো সমালোচকদের, বিশেষ করে বিরোধীদের ছোট দেখিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক দক্ষতার কথা তুলে ধরা, ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়া,  এবং সমালোচকদের অবমাননা করা। এগুলোই করা হয় ক্ষমতাসীনদের বৈধতা দেওয়ার জন্যে। বিশ্বজুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ সহজেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন বলে এই অবস্থার তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেটের বিস্তার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থানের প্রথম পর্যায়ে একে গণতন্ত্রের অগ্রদূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিলো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কর্তৃত্ববাদীরা এই অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইন্টারনেটের ব্যাপারে সজাগ হয়েছে (দেখুন, ফাহমিদা জামান, Where is thy freedom on the internet?, দ্য ডেইলি স্টার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯)। এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে ইন্টারনেটের ওপর কর্তৃত্ববাদী সরকার আইনি ও আইন-বহির্ভূত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যাকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ’ হিসেবে। সরকারের মিডিয়া এবং সাইবার স্পেস নিয়ন্ত্রণ করা তথ্য নিয়ন্ত্রণের অন্যতম বিষয়।

মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো রাষ্ট্র বা বেসরকারি সংস্থার অধীনে একটি ‘ডিজিটাল আর্মি’ গঠন করা। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের সততা এবং সহনশীলতার মতো বৈশিষ্ট্যগুলোকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য ডিজিটাল আর্মিকে লেলিয়ে দেওয়া। গত এক দশকে আমরা ‘ট্রল আর্মি’র উত্থান দেখেছি। যাদের কাজ হলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো, এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। রাশিয়ানরা এই কাজটি নিখুঁতভাবে করেছে এবং তা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে — ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রমাণ সুস্পষ্ট। চীনের ট্রল আর্মি ‘ওমুও ডাং’ বা ‘ফিফটি সেন্টস পার্টি’ নামে পরিচিত। এখানে প্রায় বিশ লাখ মানুষ কাজ করে বলে জানা গেছে। এক হিসেবে চীনে ইন্টারনেটে যতো মন্তব্য করা হয়, তার ২০ শতাংশ করে ‘ফিফটি সেন্টস পার্টি’র সদস্যরা। গত কয়েক মাসে চীনা ট্রল আর্মি হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের, বিশেষত নারীদের লক্ষ্য করেছিলো। একইভাবে ইসরায়েল, সৌদি আরব, তুরস্ক, ফিলিপাইন এবং আরও অনেক দেশের সরকার এই ধরণের আর্মি তৈরি করেছে।

এই ব্যাপারটি সরকারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোও – যারা সত্য বা প্রকৃত তথ্যের ব্যাপারে চিন্তিত নয় – তারাও এই কৌশল ব্যবহার করছে। যেমনটি হয়েছিলো ২০১৪ সালে এবং ২০১৯ সালে ভারতে। নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির ট্রল আর্মি ২০১৪ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে এবং ২০১৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভারতীয় গণতন্ত্রকে তছনছ করে দেয়। ফেসবুক এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিস্তৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০১৯ সালে একটি ব্রিটিশ সংসদীয় কমিটি, ফেসবুক সম্পর্কে রায় দিয়েছে। তাদের মতে, “এটি একটি ডিজিটাল সন্ত্রাসী যা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে” (দ্য গার্ডিয়ান, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। ফ্রিডম হাউজের ‘ফ্রিডম অন নেট ২০১৭’ প্রতিবেদন অনুসারে, অনলাইনে কারসাজি এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রভাব পড়েছে ১৮টি দেশের নির্বাচনে।

ট্রল আর্মির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, আলোচনা ও ঘটনা পরম্পরায় (ডিসকোর্স এবং ন্যারেটিভ) নতুন আকার দেওয়া। তা যে সবসময়ই অ-গণতান্ত্রিক শক্তির ইতিবাচক দিকই তুলে ধরে তা নয়, বরঞ্চ সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরগুলোর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও তাদের কাজ। তারা একত্রিত হয়ে হৈ চৈ করে বিরোধীদের কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে দেয়। তাদের বার্তাগুলো এতোটা জোরেসোরে প্রচার করে যে তাতে জনমত প্রভাবিত হয়। একদিকে যে কোনো ইস্যুতে কোনো না কোনো উপায়ে তারা বিভাজন তৈরি করে। অন্যদিকে, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে বি-রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। যাতে করে স্থিতাবস্থা বহাল থাকে যা কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে সহায়তা করে। একে অপরের টুইট পুনঃপ্রচার থেকে পোস্টে মন্তব্য করার মতো বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এসব উদ্দেশ্য সাধন করা হয়। আর এই কাজগুলোর ফলে একটা ভাষ্য তৈরি হয় যা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা সন্দেহ না করেই গ্রহণ করে। এই ট্রলগুলো শুধু জনসাধারণের আলোচনার এজেন্ডাই তৈরি করে তা নয়, এগুলো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আলোচনার বাইরে রাখতেও সাহায্য করে।

কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো: ইতিহাস নিয়ে তাদের চিন্তা। তারা ইতিহাস নতুন করে লিখে এবং সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে তা রক্ষা করে। এর মাধ্যমে তারা একাডেমিক স্বাধীনতার উপর উন্মুক্ত আক্রমণ শুরু করে। আর্ক পুডিংটন লিখেছেন, “বর্তমান সরকারের বৈধতা বাড়াতে ও তাদের লক্ষ্য অর্জন করার জন্য বেশ কয়েকটি দেশ ইতিহাস নতুন করে লেখার কাজ করেছে। কর্তৃপক্ষ ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিকদের কিছু সীমা বেঁধে দেয়।”

এই নতুন ইতিহাসের বিষয়বস্তু, বা জাল সংবাদ বা কর্তৃত্ববাদী শাসকের প্রশংসা বা অন্যান্য ঐতিহাসিক বিবরণ প্রচারণা পায় প্রযুক্তির সাহায্যে। বিশেষত, ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে তা হয়ে উঠেছে সহজসাধ্য। এর মাধ্যমে নতুন ইতিহাস এমনভাবে তুলে ধরা হয় যাতে মনে হয় এগুলো সব সত্য এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এসেছে। আমরা যখন ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি তখন আমাদের মনে রাখা দরকার এটি কেবল প্রযুক্তি নয়। জে স্কট ব্রেনেন এবং ড্যানিয়েল ক্রেইস যথাযথভাবেই উল্লেখ করেছেন যে ডিজিটালাইজেশন এমন একটি উপায়, “যেখানে সামাজিক জীবনের বিভিন্ন দিক ডিজিটাল যোগাযোগ এবং মিডিয়া অবকাঠামোকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়।” ডিজিটালাইজেশনের প্রলোভন আমাদেরকে যেনো প্রযুক্তির খারাপ দিকগুলোর বিষয়ে অন্ধ করে না রাখে সেই বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার।

প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং ভারসাম্য অনুপস্থিত থাকলে ডিজিটালাইজেশন নাগরিকের গোপনীয়তা এবং মৌলিক অধিকারগুলো কমিয়ে ফেলতে পারে। এটা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সমষ্টিগত কার্যক্রম বাড়াতে অবদান রেখেছে। তবে কর্তৃত্ববাদী সরকারকেও এটা সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে সক্রিয়তা সীমাবদ্ধ করতে, ভুয়া তথ্য তৈরি করতে। আমরা যখন ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সামাজিক মিডিয়া নিয়ে অত্যুৎসাহী হচ্ছি তখন এর মাধ্যমে ঘৃণার প্রচার, মেরুকরণ তৈরি করা এবং বি-রাজনীতিকরণের দিকগুলো অবজ্ঞা করা যায় না।

গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোকে নষ্ট করতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী সরকার। এই পটভূমিকায় আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করতে হবে।

দুটি বিষয় আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রথমত, কর্তৃত্ববাদী শাসকদের নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। দ্বিতীয়টি হলো: কর্তৃত্ববাদী শাসকদের তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, মৌলিক সংস্থাগুলোর আরও ক্ষতির এবং তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কর্তৃত্ববাদী শাসকদের প্রচেষ্টা মোকাবেলার চেষ্টা করা উচিত। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন সম্ভবত তথ্যযুদ্ধ দিয়েই শুরু করা উচিত।

আলী রীয়াজ আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক। তার সর্বশেষ বইটি হচ্ছে Voting in Hybrid Regime: Explaining the 2018 Bangladeshi Election (প্যালগ্রেভ ম্যাকমিলান, ২০১৯)।

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top