২০২০: মাঠের বাইরেই দেশের ফুটবলের উত্তাপ ছিল বেশি | The Daily Star Bangla
০২:৪২ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০ / সর্বশেষ সংশোধিত: ০৪:১১ অপরাহ্ন, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০

২০২০: মাঠের বাইরেই দেশের ফুটবলের উত্তাপ ছিল বেশি

সাব্বির হোসেন

বছর শেষের সালতামামিতে দেশের ফুটবল নিয়ে কথা বলা মানেই হচ্ছে, সেই নিত্যনৈমিত্তিক হাহাকার। কবে দেশের ফুটবল ফিরে পাবে তার হৃত গৌরব?

যে দেশের ফুটবলে মূল চ্যালেঞ্জই হচ্ছে, খেলাটাকে মাঠে ধরে রাখা, সেখানে খুব বড় বেশি আনন্দ আর উদযাপনের উপলক্ষ থাকে না। তবুও কালেভদ্রে যে দু-একটি সফলতা আসে, তা ঘিরেই আমরা আশাবাদের কিছু গল্প নিয়ে নতুন বছরে পদার্পণ করি। আক্ষেপ আর হতাশার গল্প নিয়ে তো আর বেঁচে থাকা যায় না!

ক্ষয়িষ্ণু পারফরম্যান্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তার গ্রাফও নিম্নমুখী। আর খেলাটা মাঠে থাকাই যেখানে সফলতা, সেখানে অতিমারি করোনাভাইরাসের ছোবলে জর্জরিত ২০২০ সাল এসেছে এক বড় ধাক্কা নিয়ে। তাই বছর শেষে খেলতে না পারার হাহাকারের গল্পটাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

আনন্দ-উল্লাসের উপলক্ষ হয়তো সেরকম মিলত না। কিন্তু বছর শেষে আমাদের নতুন বছরের জন্য কী করতে হতো, সেটুকু থেকেও এবার বঞ্চিত হয়েছে দেশের ফুটবল। কারণ, এই মহামারির জন্য ফুটবল যে বন্ধ ছিল লম্বা সময়ের জন্য।

একজন ফুটবলারের জন্য একটি মৌসুম হারিয়ে যাওয়া মানে, সে কেবল আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তার বেড়ে ওঠার সুযোগও বিনষ্ট হয়। যাক, তারপরও তো ফুটবলটা মাঠে ফিরে এসেছে। সেটাই বছর শেষে কম পাওয়া কী!

গত মার্চে লিগ স্থগিত ও পরবর্তীতে তা পরিত্যক্ত হওয়ার পর ফের ফুটবল মাঠে গড়ায় অনেকটা সময় পেরিয়ে- নভেম্বরে আন্তর্জাতিক ফুটবল, ডিসেম্বরে ঘরোয়া ফুটবল দিয়ে। তবে ছেলেদের ঘরোয়া আসর শুরুর আগেই চালু হয়ে যায় স্কুল ফুটবল ও নারী ফুটবল। আর সংগঠকরাও ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পান। অনেক না পাওয়ার বেদনার মাঝে এটুকুই হয়তো সান্ত্বনা।

ফুটবল মাঠে ছিল না, তা ঠিক। তবে ঘরোয়া ফুটবলকে ঘিরে উত্তেজনা কম ছিল না। নিন্দুকরা কিন্তু বলেন যে, এই সংকটময় মুহূর্তে ফুটবল নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে একটু বেশিই ছিল। সেটা মূলত বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেরকম সরগরম ছিল, তাকে নজিরবিহীনই বলা চলে।

কাজী সালাহউদ্দিনই বাফুফে সভাপতি

সময়ের চাকা ঘুরেছে চার বছর। ফের অনুষ্ঠিত হয়েছে বাফুফের নির্বাচন। তবে ফল বদলায়নি। আবারও সভাপতি পদে আসীন হয়েছেন কাজী সালাহউদ্দিন, টানা চতুর্থবারের মতো। আর সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে ফের নির্বাচিত হয়েছেন সালাম মুর্শেদী।

গত অক্টোবরের নির্বাচনে ১৩৯ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ১৩৫ জন তাদের ভোট প্রদান করেন। সভাপতি পদে বিজয়ী সম্মিলিত পরিষদের প্রার্থী সালাহউদ্দিন দেখান একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তিনি ভোট পান ৯৪টি। তার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বাদল রায়  ৪০টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মানিক মাত্র ১টি ভোট পান।

নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আকারে সালাহউদ্দিনের বিগত তিন মেয়াদের কর্মকাণ্ডের ব্যবচ্ছেদ হয়ে আসছিল। কারণ, প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতির বিপরীতে প্রাপ্তি সামান্যই ছিল। তাকে নিয়ে তাই ছিল জোর সমালোচনা। এমনকি নির্বাচন চলাকালীনও ভোট কেন্দ্রের বাইরে একদল ফুটবল সমর্থক তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। তবে চূড়ান্ত ফলে এসবের কোনো প্রভাব পড়েনি।

নির্বাচনে নিয়ে নাটকীয়তার কমতি ছিল না। গত চার বছর প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে এবং দেশের ফুটবল অঙ্গনে সক্রিয় থাকলেও সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার সিদ্ধান্ত নেন তরফদার রুহুল আমিন। তার অনুপস্থিতিতে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন বাদল রায়।

এরপর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন প্রয়াত সাবেক তারকা ফুটবলার বাদল। যদিও ওই নির্বাচনে তাকে চাপ প্রয়োগ করার অভিযোগ উঠেছিল। ভরাডুবির পর আরেক প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মানিক বলেছিলেন, শুধু তার সঙ্গে নয়, জনগণের সঙ্গেও কাউন্সিলররা প্রতারণা করেছেন।

জেমি ডের সঙ্গে নতুন চুক্তি

গত অগাস্টে জেমি ডের সঙ্গে দুই বছরের নতুন চুক্তি করে বাফুফে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে কোচদের দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্বে থাকার নজির নেই বললেই চলে, যা দেশি-বিদেশি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে জেমি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী একটি উদাহরণ।

২০১৮ সালে এক বছরের চুক্তিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন জেমি। দ্বিতীয় দফায় তার চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। এবার নতুন করে আরও দুই বছরের জন্য তাকে চুক্তিবদ্ধ করেছে দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তার চাওয়া অনুসারে জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে যুক্ত হয়েছে রেকর্ড ছয় জন বিদেশি স্টাফ।

লিগ পরিত্যক্ত, মৌসুম বাতিল

করোনাভাইরাসের প্রকোপে গত মার্চে স্থগিত হয়ে যায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল। তার আগে মাঠে গড়াতে পেরেছিল মাত্র ছয়টি রাউন্ড। এরপর মে মাসে ২০১৯-২০ মৌসুমের বাকি অংশ বাতিল করে বাফুফে। ফলে দুই মাস ধরে স্থগিত হয়ে থাকা লিগও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তাই কোনো দল চ্যাম্পিয়ন হয়নি, কোনো ক্লাবের অবনমনও ঘটেনি।

জাতীয় দলের পারফরম্যান্সের খতিয়ান

বৈশ্বিক মহামারির কারণে বছরজুড়ে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। কিন্তু সেই একই ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার দৃশ্যের বদল হয়নি। শুরু আর শেষটাও একই মিলে যায় একই বিন্দুতে। গত জানুয়ারিতে নিজেদের মাটিতে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে ফিলিস্তিনের কাছে ২-০ গোলের হার দিয়ে জামাল ভূঁইয়াদের শুরু, আর শেষটা চলতি ডিসেম্বরে কাতারের মাটিতে বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইপর্বের ম্যাচে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে।

সবমিলিয়ে ২০২০ সালে মোট ছয়টি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। দুটি জয়ের বিপরীতে হার তিনটিতে। বাকি ম্যাচটি হয় ড্র। গোল্ডকাপের গ্রুপপর্বে শ্রীলঙ্কাকে ৩-০ গোল উড়িয়ে সেমিফাইনালে বুরুন্ডির কাছে একই ব্যবধানে জোটে হার। অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরার ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতলেও দ্বিতীয় প্রীতি ম্যাচে সন্তুষ্ট থাকতে হয় ড্র নিয়েই।

তিন-চতুর্থাংশ ফুটবলারের করোনা শনাক্ত

গত অক্টোবর-নভেম্বরে মাঠে গড়ানোর কথা ছিল যৌথ বাছাইপর্বের বাকি থাকা ম্যাচগুলো। সে লক্ষ্যে দুই মাস আগে অর্থাৎ অগাস্টে জৈব সুরক্ষা বলয়ে থেকে ক্যাম্প শুরু করেছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু ক্যাম্প শুরুর আগেই দুসংবাদে নড়েচড়ে বসতে হয় দেশের ফুটবলপ্রেমীদের।

এক পর্যায়ে, ডাক পাওয়া ৩৬ ফুটবলারের ২৪ জনকে পরীক্ষা করে ১৮ জনের শরীরেই করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সৌভাগ্যবশত, কারও শারীরিক অবস্থাই সংকটাপন্ন পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে বাছাইপর্ব আরেক দফা স্থগিত হয়ে গেলে ক্যাম্প বাতিল হয়।

বছরের শেষদিকে করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ হন কোচ ডে ও অধিনায়ক জামাল। স্বস্তির খবর হলো, দুজনই সুস্থ হয়ে উঠেছেন।

কলকাতা মোহামেডানে জামাল

সাইফ স্পোর্টিং থেকে ধারে ভারতের আই লিগের ঐতিহ্যবাহী দল কলকাতা মোহামেডানে যোগ দিয়েছেন জামাল। গুঞ্জনের সূত্রপাত হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরেই, তবে আনুষ্ঠানিক খবর মেলে নভেম্বরে। আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সাদা-কালোদের জার্সিতে খেলার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে কলকাতায় উড়ে গিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনুশীলন শুরু করেছেন দেশের ফুটবলের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় এই বিজ্ঞাপন।

ঘরোয়া ফুটবলের ফেরা

বছরের একদম শুরুতে ফেডারেশন কাপে চমক দেখিয়েছিল রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটি। যদিও ফাইনালে তারা হেরে যায় বসুন্ধরা কিংসের কাছে। এরপর মৌসুম বাতিলে লম্বা সময় মাঠে ছিল না খেলা। ধাক্কা সামলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের স্বাদ মিললেও ঘরোয়া ফুটবলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় নয় মাসেরও বেশি সময়। চলতি মাসে ফেডারেশন কাপের আরেকটি আসর দিয়ে সরব হয়ে উঠেছে দেশের ফুটবল অঙ্গন।

র‍্যাঙ্কিং থেকে উধাও নারী দল

ছেলেরা তাও কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেই বাংলাদেশের মেয়েরা। তার খেসারত দিয়ে চলতি মাসে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের সবশেষ সংস্করণে বাদ পড়েছেন সাবিনা-কৃষ্ণারা। আগের র‍্যাঙ্কিংয়ে মেয়েদের অবস্থান ছিল ১৩৪তম। ১৮৭ নম্বরে থেকে বছর শুরু করা ছেলেরা শেষ করেছে ১৮৬তম অবস্থানে থেকে।

যা কিছু স্থগিত-বাতিল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে অনেক আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল বাফুফের। সেসব সঙ্গত কারণেই আলোর মুখ দেখেনি। অনেক বৈশ্বিক আসরের ধারায় সাফ ফুটবলও পিছিয়ে গেছে এক বছরের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার বয়সভিত্তিক কয়েকটি প্রতিযোগিতাও হতে পারেনি করোনার কারণে।

অর্জনের ঝুলিতে যা কিছু

এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) ‘একাডেমি অ্যাক্রিডিটেশন স্কিম’-এর আওতায় সারা দেশের ফুটবল একাডেমিগুলোকে নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাফুফে। সবমিলিয়ে নিবন্ধন পেয়েছে ৭৮টি একাডেমি। ‘প্রকল্পের মানদণ্ডের অধীনে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহকারী একাডেমি’গুলোকে নিবন্ধন করানো হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে স্টার রেটিং।

ফুটবল ফের চালু হওয়ার পর জেএএফ কাপ ও স্কুল ফুটবলের আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ ছয় বছর পর মাঠে গড়িয়েছে নারী ফুটবল লিগও।

শেষ পর্যন্ত বছর শেষে যে কথাটি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, কাজী সালাহউদ্দিন সত্যিই কি ফুটবলে নতুন পথ চলার দিশা দেখাতে পারবেন?

Stay updated on the go with The Daily Star Android & iOS News App. Click here to download it for your device.

Grameenphone and Robi:
Type START <space> BR and send SMS it to 2222

Banglalink:
Type START <space> BR and send SMS it to 2225

পাঠকের মন্তব্য

Top